আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরের টানা সাত দিনের ছুটিতে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে পুরোপুরি প্রস্তুত ‘চায়ের দেশ’ খ্যাত পর্যটন জেলা মৌলভীবাজার। জেলার সাতটি উপজেলার শতাধিক পর্যটন স্পট ও প্রায় দেড় শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট এখন উৎসবের অপেক্ষায়। ইতোমধ্যে অভিজাত রিসোর্ট ও ইকো কটেজগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ রুম আগাম বুকিং সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, রমজান মাসজুড়ে প্রায় পর্যটক-শূন্য ছিল মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল। এতে স্থবির হয়ে পড়ে স্থানীয় পরিবহন ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসা। তবে আসন্ন ঈদ উপলক্ষে আবারও আশায় বুক বাঁধছেন চাঁদের গাড়ির চালক ও ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নতুন করে সাজানো হয়েছে প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্র এবং হোটেল-রিসোর্ট। আগত পর্যটকদের জন্য জেলার পাঁচতারকা হোটেল-রিসোর্ট ও গেস্ট হাউসগুলোতে ঘোষণা করা হয়েছে নানা আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি।
এদিকে, এবারের ঈদে দীর্ঘ ছুটি থাকায় ‘চায়ের রাজধানী’ খ্যাত শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন রিসোর্ট ও কটেজে আগাম বুকিংয়ের চাপ লক্ষ্য করা গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার রাধানগর এলাকায় অবস্থিত প্রায় অর্ধশত রিসোর্ট ও কটেজে ২২ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত এই তিন দিনের জন্য প্রায় ৮০ শতাংশ বুকিং ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। আর শহর ও শহরতলির হোটেলগুলোর প্রায় ৫০-৮০ শতাংশ রুম বুকিং হয়েছে বলে জানা গেছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে পর্যটকদের বড় একটি অংশ শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে চান। এ কারণে তারা শহরের হোটেলের পরিবর্তে শহরের বাইরে অবস্থিত রিসোর্ট ও কটেজে থাকতে বেশি আগ্রহী।
মৌলভীবাজার জেলাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়ি ছড়া, চা-বাগান ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনস্থল। এ জেলার প্রতিটি কোণেই রয়েছে চোখ জুড়ানো সব দর্শনীয় স্থান, যা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। জেলার ৯২টি চা-বাগানের সবুজের সমারোহ, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জীববৈচিত্র্য, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের গর্জন, অপরূপ মাধবপুর লেকের নয়নাভিরাম দৃশ্য আর ঐতিহাসিক স্থানসমূহ মিলে মৌলভীবাজার প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক আকর্ষণীয় গন্তব্য।
পাহাড়ি পথ আর ঘন সবুজ অরণ্যের অপরূপ সৌন্দর্য যে কাউকে আকৃষ্ট করে। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চায়ের রাজ্য মৌলভীবাজারে একবার আসলে মন চায় আবার আসতে। যেখানে সবুজ প্রকৃতি উজারভাবে সৌন্দর্য বিলিয়ে দেয়। আর পর্যটকেরা হারিয়ে যান চিরসবুজের মাঝে।
চা বাগানের সতেজ সবুজ পাতার মায়া যেকোনো ভ্রমণপিপাসু মনকে টানতে সক্ষম। চারদিকে প্রকৃতির নজরকাড়া সৌন্দর্য, হাজার প্রজাতির গাছ-গাছালি, দিগন্তজোড়া হাওর আর নীল জলরাশিতে ঢেউয়ের ছন্দে প্রাণ জুড়িয়ে যায় দর্শনার্থীদের।
জেলার মনোমুগ্ধকর পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্র (বিটিআরআই), হাইল হাওর, বাইক্কা বিল, চা জাদুঘর, চা কন্যার ভাস্কর্য, রমেশ রাম গৌড়ের আবিষ্কৃত সাত রঙের চা, বধ্যভূমি ‘৭১, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন।
রাবার বাগান, গোলটিলা, হাজমটিলা, সীতেশ বাবুর বন্যপ্রাণী সেবাকেন্দ্র, খাসিয়া পুঞ্জি, মনিপুরী সম্প্রদায়ের তাঁতশিল্প, গারোপল্লী, ভাড়াউড়া লেক, শংকর টিলা, কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, সীমান্তবর্তী ধলই চা বাগানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, মাধবপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, পদ্মছড়া লেক, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, আদমপুর সংরক্ষিত বন, মণিপুরী পল্লী, শমসেরনগর বিমানবন্দর, ক্যামেলিয়া লেক, মণিপুরী ললিতকলা একাডেমি, শমসেরনগর গলফ মাট, কুলাউড়া উপজেলায় হাকালুকি হাওর, পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি, কালাপাহাড়, রাজনগর উপজেলায় কমলা রাণীর দীঘি, পাখিবাড়ি, রাজা সুবিদ নারায়নের রাজবাড়ি, জনার্দন কর্মকারের বাড়ি, জমিদার বাড়ি, লীলা নাগের পৈতৃক বাড়ি, পাঁচগাঁও লাল দুর্গা মন্দির জুড়ী উপজেলায় কমলা বাগান, লাঠিটিলা বনাঞ্চল।
এছাড়া মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক, হয়রত শাহ মোস্তফা (রহ.) মাজার শরীফ, মনু ব্যারেজ, কাসিমপুর পাম্প হাউস, ঐতিহাসিক খোঁজার মসজিদ, শেরপুর মুক্তিযোদ্ধা গোল চত্বর, বড়লেখা উপজেলায় মাধককুন্ড জলপ্রপাত, কমলা রানীর দিঘি, সুজানগর আগর কারখানা, মুরইছড়া বনাঞ্চল, আগর বাগান, পাথারিয়া বনাঞ্চলসহ শতাধিক মনোমুগ্ধকর পর্যটন স্পট।
গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের জেনারেল ম্যানেজার আরমান খান বলেন, ঈদের সময়ে সাধারণত বিদেশি পর্যটক খুব একটা আসেন না, তবে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকদের আগমন বেশি থাকে। এবারের ঈদে আমাদের বুকিং প্রায় শতভাগ পূর্ণ হয়ে গেছে।
বালিশিরা রিসোর্টের পরিচালক (পরিচালনা ও প্রশাসন) জাহানারা আক্তার বলেন, আগামী ২১ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, গতবারের তুলনায় এবার আরও বেশি পর্যটক আসবেন এবং ব্যবসাও ভালো হবে।
জেলা প্রশাসন জানায়, পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা যাতে না ঘটে সে লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ট্যুরিস্ট পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের ওসি মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি। বিভিন্ন পর্যটন স্পটে আমাদের টহল ব্যবস্থা সার্বক্ষনিকভাবে চালু থাকবে।
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, ঈদের ছুটিতে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে এবং পর্যটকেরা নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরতে পারে, এ জন্য সব ধরণেরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এফআর