স্বাধীনতা দিবস : উন্নত বাংলাদেশ গড়ার নতুন প্রত্যয়

মো. নূর হামজা পিয়াস

মতামত

বাংলাদেশ একটি দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। এটি ছিল কেবল একটি ভূখণ্ডের অধিকার আদায়ের যুদ্ধ নয়, বরং

2026-03-26T04:13:16+00:00
2026-03-26T04:13:16+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
মতামত
স্বাধীনতা দিবস : উন্নত বাংলাদেশ গড়ার নতুন প্রত্যয়
মো. নূর হামজা পিয়াস
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬, ৪:১৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বাংলাদেশ একটি দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। এটি ছিল কেবল একটি ভূখণ্ডের অধিকার আদায়ের যুদ্ধ নয়, বরং বাঙালি জনগণের অস্তিত্ব রক্ষার এক চরম সংগ্রাম। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭০ সলের নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ছিল এই স্বাধীনতার সোপান। শোষণের শৃঙ্খল ভেঙে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার যে তীব্র আকাক্সক্ষা বাঙালির মনে দানা বেঁধেছিল, তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালে। এই সংগ্রাম আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে হয়।

বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য এবং দেশের আপামর মুক্তিযোদ্ধারা জীবনপণ সংগ্রামে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও মেহনতি মানুষ হাতের কাছে যা ছিল তাই নিয়ে শত্রু মোকাবিলায় নেমে পড়েন। মুক্তিবাহিনী প্রচলিত সমরকৌশল এবং গেরিলা যুদ্ধের এক নিখুঁত সংমিশ্রণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচণ্ডভাবে লড়াই করেছিল। দেশের প্রতিটি গ্রাম ও জনপদ তখন হয়ে উঠেছিল এক একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সেই অসীম সাহসিকতা আজও আমাদের জাতীয় চেতনার প্রধান উৎস হয়ে আছে।

দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সম্মুখ যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এই বিজয় বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সুনিশ্চিত করতে সাহায্য করে এবং এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কূটনীতির পাশাপাশি আমাদের স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় ও শক্তিশালী সামাজিক সংহতি তৈরি হয়েছে। ৩০ লাখ শহিদের রক্ত আর ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয় আমাদের শ্রেষ্ঠতম অর্জন।

মুক্তিযুদ্ধের সেই কঠিন দিনগুলোর প্রতিরোধ, ত্যাগ এবং বীরত্বের উত্তরাধিকার আজও আমাদের সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় ঐক্যের পথে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রগতির মূলে রয়েছে সেই অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যের চেতনা। ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়, যখন বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর চূড়ান্ত দমন-পীড়নের জন্য ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে একটি নৃশংস সশস্ত্র অভিযান শুরু করে। এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য গণহত্যা। রাতের অন্ধকারে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা চেয়েছিল অস্ত্রের মুখে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে। কিন্তু সেই কালরাত উল্টো বাঙালির মনে প্রতিরোধের দাবানল জ্বালিয়ে দিয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

সেই অভিশপ্ত রাতে পাকিস্তানি সেনারা নিরীহ মানুষের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং মানব ইতিহাসে কলঙ্কজনক লুটপাট ও ধর্ষণের উৎসবে মেতে ওঠে। তারা হাজার হাজার নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিক, দেশপ্রেমিক ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করে। এই পরিকল্পিত গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করা এবং চিরকাল গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ রাখা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে রাজারবাগ পুলিশ লাইন প্রতিটি স্থান সেদিন বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল।

বাঙালি সশস্ত্র কর্মীদের সম্পূর্ণভাবে হত্যা ও নির্মূল করার হীন উদ্দেশ্যে তারা ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অংশে অবস্থিত সামরিক ব্যারাক এবং আধাসামরিক ইউনিটগুলোতে অতর্কিত হামলা চালায়। তবে শত্রু জানত না যে, বাঙালির দেশপ্রেম বুলেটের চেয়েও শক্তিশালী। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর এবং পুলিশ সদস্যরা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। নিজের জীবন বাজি রেখে তারা দেশের মাটি রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই তাৎক্ষণিক প্রতিরোধই ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুর অধ্যায়।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ঘোষিত হয়। এই ঘোষণাটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের দীর্ঘ যাত্রাপথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। যখন পাকিস্তানি জান্তা আলোচনার নামে প্রতারণা করে বাঙালির ওপর মরণকামড় দিয়েছিল, তখনই এই চূড়ান্ত ঘোষণা জাতির সামনে মুক্তির দিশারি হয়ে আসে। ২৬ মার্চ কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি জাতির পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার অঙ্গীকার। 

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছিল। বিশ্ব সম্প্রদায় বুঝতে পেরেছিল যে, দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নতুন ও ন্যায়নিষ্ঠ রাষ্ট্রের জন্ম হতে যাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাঙালির ওপর চলা নির্যাতনের খবর এবং স্বাধীনতার ঘোষণার খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয়। বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো বাংলাদেশের এই ন্যায়সংগত সংগ্রামের পাশে দাঁড়াতে শুরু করে। ২৬ মার্চ আমাদের রাজনৈতিক বৈধতা এবং বিশ্বদরবারে মস্তক উঁচু করে দাঁড়ানোর আইনি ও নৈতিক ভিত্তি প্রদান করেছিল।

আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে ২৬ মার্চ হলো সাহস ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। যারা যুদ্ধ দেখেনি, তারা এই দিনটির মাধ্যমে জানতে পারে কীভাবে তাদের পূর্বপুরুষরা শূন্যহাতে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এক সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করেছিল। এটি বর্তমানের তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি ও দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করে। ২৬ মার্চের শিক্ষা হলো- সততা ও লক্ষ্য যদি স্থির থাকে, তবে যেকোনো বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। আজকের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার কারিগরদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের এই সূচনালগ্ন এক অপরাজেয় অনুপ্রেরণা।

২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার মূলে ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার। যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বাস করবে। পাকিস্তানি দ্বিজাতিতত্ত্বের অসারতা প্রমাণ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে জয়গান সেদিন শুরু হয়েছিল, তা আজও আমাদের সংবিধানের মূল স্তম্ভ। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সেই শপথ ২৬ মার্চকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি। ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা কেবল রাজনৈতিক মুক্তির কথা বলেনি, বরং শোষিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিল। গত ৫ দশকে বাংলাদেশ কৃষি, শিল্প ও প্রযুক্তিতে যে উন্নতি করেছে, তার মূলে রয়েছে সেই স্বাধীনতার চেতনা। মহাকাশ বিজয় সবই যেন ২৬ মার্চের সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতিফলন। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার যে ডাক সেদিন দেওয়া হয়েছিল, তা আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।

আমাদের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ২৬ মার্চের প্রভাব অপরিসীম। অসংখ্য কবিতা, গান, নাটক ও চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নের সেই উত্তাল দিনগুলো উঠে এসেছে। ২৬ মার্চ আমাদের সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বেরও প্রতীক। বাঙালি সংস্কৃতির স্বকীয়তা রক্ষা করার যে শপথ সেদিন নেওয়া হয়েছিল, তা আজ বিশ্বদরবারে আমাদের আলাদা পরিচয় দান করেছে।

আজকের আধুনিক ও পেশাদার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বীরত্বের শেকড় প্রথিত সেই ২৬ মার্চের বিদ্রোহে। ১৯৭১ সালে যারা বিদ্রোহ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাদের উত্তরসূরিরাই আজ বিশ্বশান্তি রক্ষায় জাতিসংঘ মিশনে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করছেন। ২৬ মার্চ আমাদের সামরিক বাহিনীকে শিখিয়েছে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার পাঠ। এই দিনটি আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নৈতিক ও ঐতিহাসিক শক্তির উৎস, যা দেশের সীমানা রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করে চলেছে।

২৬ মার্চ কেবল ক্যালেন্ডারের একটি লাল তারিখ নয়, এটি আমাদের হৃদস্পন্দন, আমাদের অহংকার। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে- বিভেদ নয়, ঐক্যই আমাদের শক্তি। বিশ্বায়নের এই যুগে জাতীয় পরিচয় ধরে রাখতে এই দিনটি আমাদের আরও বেশি সাহস জোগায়। তাই দুর্নীতিমুক্ত, সমৃদ্ধ ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়াই হবে মহান স্বাধীনতা দিবসের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা।

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   স্বাধীনতা  দিবস  উন্নত  বাংলাদেশ  গড়া  প্রত্যয় 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: