রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির ঘটনায় নিহতদের বাড়ি বাড়ি চলছে শোকের মাতম। বিশেষ করে স্বজনদের আহাজারি যেন কোনোভাবেই থামছে না। শোক আর সান্ত্বনা জানাতে নিহতদের বাড়িতে ভিড় করেন গ্রামবাসীরাও। এ সময় এই ঘটনায় দায়ীদের বিচার চেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় তাদের।
কুষ্টিয়ায় ভারী হয়ে উঠে চার গ্রামের পরিবেশ
কুষ্টিয়ার চারজনের মরদেহের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনজনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে, একজনের শেষকৃত্য হয়েছে।
কুষ্টিয়ার নিহতরা হলেন কুষ্টিয়া পৌরসভার মজমপুর এলাকার মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), খোকসা উপজেলার খাগড়বাড়িয়ার হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), একই উপজেলার ধুশুন্ডু গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইস্রাফিল (৩) এবং একই উপজেলার সমসপুর গ্রামের গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩)। চারটি মরদেহ বুধবার রাতেই বাড়িতে আনা হয়। সেখানে তখন স্বজন ও প্রতিবেশীদের আহাজারিতে শোকাবহ পরিবেশের তৈরি হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে স্বজন ও গ্রামবাসী তাদের জানাজার জন্য জড়ো হন। এর মধ্যে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সদর উপজেলার জুগিয়া গ্রামে মর্জিনা খাতুনের জানাজা এবং পরে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
এদিকে খোকসা থানার ওসি মোশাররফ হোসেন বলেন, উপজেলার নিহত দুজনের দাফন এবং একজনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।
পাশাপাশি কবরে তিনজন
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাস দুর্ঘটনায় নিহত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান, তার মা ও ভাগনেকে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজবাড়ী শহরের ভবানীপুরে জানাজা শেষে সেখানকার কবরস্থানে তিনজনকে শায়িত করা হয়।
তারা হলেন রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর গ্রামের লালমিয়া সড়কের মৃত ইসমাঈল হোসেন খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১), ছেলে রাইয়ান (২৫) এবং রাইয়ানের ভাগনে রাজবাড়ী পৌরসভার সজ্জনকান্দার কেবিএম মুসাব্বিরের ছেলে তাজবিদ (৭)।
বুধবার রাতেই তাদের মরদেহ ভবানীপুরের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সকালে সেই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ি ও চারপাশে শত শত মানুষ। চারপাশে এক শোকাবহ পরিবেশ। বাড়ির সামনে খাটিয়ায় দুটি মরদেহ রাখা হয়েছে, আরেকটি ভেতরে। গ্রামের মানুষজন আসছেন পরিবারের লোকদের সান্ত্বনা দিতে। তাদের চোখেও ছিল জল।
রাইয়ানের স্বজন ফারুক হোসেন বলেন, রাইয়ান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। শুধু পড়াশোনায় নয়, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ বিতার্কিক। স্কুলজীবন থেকেই জাতীয় পর্যায়ে বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়েও যুক্ত ছিলেন বিতর্কচর্চায়। যুক্তি, বুদ্ধি আর সচেতনতার আলো ছড়ানোই ছিল তার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে গেল পদ্মার গভীরে। রাইয়ান শুধু একজন শিক্ষার্থী ছিলেন না, ছিলেন একজন সচেতন নাগরিক। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ নানা সামাজিক উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি।
সাদ আহম্মেদ সাদি বলেন, ঈদের ছুটি কাটাতে বাড়িতে এসেছিলেন রাইয়ান। পরিবারের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটিয়ে আবার ঢাকায় ফিরছিলেন। সঙ্গে মা রেহানা আক্তার, চিকিৎসক বোন নুসরাত জাহান খান এবং বোনের আট বছর বয়সি ছেলে তাজবিদ ছিল। বাসটি তলিয়ে যাওয়ার সময় সবাই বাসের ভেতরে ছিলেন। রাইয়ানের বোন কোনোরকমে বেরিয়ে আসতে পারেন। কিন্তু বাকি তিনজন ভেতরেই আটকা পড়েন। পরে রাতে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সাদি জানান, ডিসেম্বরেই মারা যান রাইয়ানের বাবা। সেই শোক কাটতে না কাটতেই পরিবারে এমন নির্মম আঘাত এলো।
এফআর