উন্নয়নের মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল

আমানুর রহমান

মতামত

​বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম দৃশ্যমান সূচক হলো এর ক্রমবর্ধমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন। কিন্তু এই উন্নয়নের চাকায় পিষ্ট হয়ে

2026-03-27T04:13:43+00:00
2026-03-27T04:22:55+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬,
২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
মতামত
উন্নয়নের মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল
আমানুর রহমান
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬, ৪:১৩ এএম  আপডেট: ২৭.০৩.২০২৬ ৪:২২ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
​বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম দৃশ্যমান সূচক হলো এর ক্রমবর্ধমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন। কিন্তু এই উন্নয়নের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রতিদিন যে অগণিত মানুষের প্রাণ ঝরছে তা আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার এক গভীর কাঠামোগত ও নীতিগত ব্যর্থতার দিকেই আঙুল তোলে। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব আন্দোলনের প্রায় আট বছর পেরিয়ে গেলেও সড়কে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা আজও এক মরীচিকা। 

শিক্ষার্থীরা সে সময় দেখিয়ে দিয়েছিল যে, আইন মানলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব। কিন্তু প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে। উৎসবের আনন্দ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন যাতায়াত সবখানেই যেন সাধারণ মানুষের জন্য মৃত্যুর ফাঁদ পেতে আছে।

সড়কে মৃত্যু আজ আর নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২৪ সালে দেশে মোট ৬ হাজার ৯৭৪টি দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ২৩৭ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং আহত হয়েছিলেন ১৩ হাজার ১৯০ জন। 

অথচ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৩৬৯-এ, যেখানে প্রাণ হারান ৯ হাজার ৭৫৪ জন এবং আহত হন ১৫ হাজার ৯৬ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিহতের হার ৫.৬০ শতাংশ এবং আহতের হার ১৪.৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মৃত্যুর মিছিলে সবচেয়ে বেশি ঝরে যাচ্ছে সমাজের অত্যন্ত উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী— চালক, পথচারী ও শিক্ষার্থীরা।

​এই বিপুল প্রাণহানির একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের পরিবহন পরিকল্পনার কাঠামোগত গলদ এবং ছোট যানের মহামারি। অধিক জনঘনত্বের এই দেশে গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও রাষ্ট্র ছোট যানবাহনকে উৎসাহিত করছে। ২০১৫ সালে দেশে মোটরসাইকেল ছিল মাত্র ১৫ লাখ, আর ২০২৫ সালের বাস্তবতায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ লাখের বেশি। 

এর পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের সংখ্যাও ৬০ লাখ ছাড়িয়েছে। ফলে ২০২৪ সালে যেখানে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত হন, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯৮৩ জনে; যা ওই বছরের মোট নিহতের প্রায় ৩০.৫৮ শতাংশ। এ ছাড়া উৎসবের সময় গণপরিবহন সংকটকে পুঁজি করে চলাচলের অনুপযোগী বাসগুলোকে রং চং করে দূরপাল্লার রুটে নামানো হয় এবং সিটি সার্ভিসের অনভিজ্ঞ চালকদের হাতে স্টিয়ারিং তুলে দেওয়া হয়। 

বাংলাদেশে এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনাই ঘটে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে।

কেবল সড়ক নয়, নৌ ও রেলপথও আজ চরম অরক্ষিত। গত ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমাদের ঘাট কর্তৃপক্ষের চরম অব্যবস্থাপনার নগ্ন দৃষ্টান্ত। একটি ছোট ফেরির সজোরে ধাক্কায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনাটি কোনোভাবেই নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি কর্তৃপক্ষের চরম দায়িত্বহীনতা। অন্যদিকে সারা দেশে তিন হাজারেরও বেশি অরক্ষিত লেভেলক্রসিং রয়েছে। 

এ বছর ঈদের দিন রাত ৩টায় কুমিল্লার পদুয়াবাজারে ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জন  এবং ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর ভৈরবে ট্রেন দুর্ঘটনায় ১৯ জন প্রাণ হারানোর ঘটনায় কেবল নিচের স্তরের কর্মীদের সাময়িক বরখাস্ত করেই দায় এড়ানো হয়, কিন্তু উচ্চপদস্থদের জবাবদিহি বরাবরই আড়ালে থেকে যায়।

পরিবহন খাতের এই নৈরাজ্যের মূলে রয়েছে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। গবেষণা অনুযায়ী, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস পরিবহন খাত থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকার অবৈধ চাঁদাবাজি হয়, যার ভাগ যায় বিআরটিএর অসাধু কর্মকর্তা, হাইওয়ে পুলিশ এবং রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের পকেটে। 

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ প্রণয়ন হলেও পরিবহন মাফিয়া ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপে এর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারা শিথিল করে কার্যত আইনটিকে অকার্যকর করে ফেলা হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনার এই ভয়াবহতা কেবল মানবিক বিপর্যয় নয়, দেশের অর্থনীতির জন্যও বিশাল অশনিসংকেত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর জিডিপির ২ থেকে ৫ শতাংশ হারাচ্ছে, যার আর্থিক পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে পরিবারটি চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। 

অথচ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ব্যবস্থাটিও অত্যন্ত আমলাতান্ত্রিক। সরকারি ট্রাস্টি বোর্ডে আড়াইশ কোটি টাকার বেশি জমা থাকলেও আইনি জটিলতার কারণে নিহতদের পরিবারের মাত্র ৯.৮৬ শতাংশ মানুষ ৫ লাখ টাকার এই ক্ষতিপূরণটুকু পেয়েছেন।

সড়ক বা নৌপথে শৃঙ্খলা ফেরাতে কেবল কাগুজে আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন এর কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। প্রতিটি গাড়িতে জিপিএস ট্র্যাকিং বাধ্যতামূলক করা, চালকদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ প্রদান, মহাসড়কে ধীরগতির যানের জন্য পৃথক লেন তৈরি এবং চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। পরিবহন খাতের মুনাফালোভী মাফিয়া চক্র ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে। 

যতদিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত না হচ্ছে এবং রাষ্ট্র নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা বিধানের প্রকৃত দায়ভার গ্রহণ না করছে, ততদিন এই অকালমৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব নয়। 

আমাদের প্রত্যাশা— সড়ক হোক নিরাপদ, মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তাটুকু অন্তত ফিরে আসুক।


লেখক : শিক্ষার্থী, স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, ঢাকা

এফআর


  বিষয়:   সম্পাদকীয়  উন্নয়ন  মহাসড়ক  মৃত্যু  মিছিল 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: