ইসরায়েলের সেনাবাহিনীতে ক্রমবর্ধমান জনবল সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইডিএফ প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির। এক নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করেন যে, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সেনাবাহিনী ভেতর থেকেই ধসে পড়তে পারে। তিনি জানান, পরিস্থিতির গুরুতরতা বোঝাতে ইতোমধ্যে তিনি অন্তত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ‘লাল সংকেত’ তুলে ধরেছেন।
সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানায়, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। শুধু যুদ্ধকালীন নয়, ভবিষ্যতে শান্তিকালেও গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও পশ্চিম তীরসহ বিভিন্ন সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও বেশি সংখ্যক সৈন্যের প্রয়োজন হবে। কিন্তু বর্তমান জনবল দিয়ে এই চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। নতুন করে পর্যাপ্ত সংখ্যক সৈন্য যোগ না হলে বিভিন্ন ফ্রন্টে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে হরেদি (অতি-অর্থডক্স ইহুদি) সম্প্রদায়ের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ কার্যকর না হওয়াকে দেখা হচ্ছে। বহুদিন ধরে এই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। সরকার একটি বিতর্কিত আইন আনার চেষ্টা করেছিল, যার মাধ্যমে হরেদিদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করার কথা ছিল। তবে সমালোচকদের মতে, এটি ছিল মূলত প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকারে থাকা ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন ধরে রাখার একটি রাজনৈতিক কৌশল, বাস্তব সমাধান নয়।
পরবর্তীতে ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু হলে সরকার জাতীয় ঐক্যের কথা বলে এই ড্রাফট বিলটি স্থগিত রাখে। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি থেমে যায় এবং সংকট আরও গভীর হয়।
আইডিএফ প্রধানের এই সতর্কবার্তার পর বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা সরব হয়ে ওঠেন। তারা অভিযোগ করেন, সরকার দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি উপেক্ষা করছে এবং এখন পরিস্থিতি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিরোধী দল ইয়েশ আতিদ জরুরি আলোচনার দাবি জানিয়ে একটি চিঠিতে উল্লেখ করে যে, এই সমস্যা আর শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতবিরোধ নয়—এটি সরাসরি দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
বিরোধী নেতা ইয়ার ল্যাপিড বলেন, ভবিষ্যতে কোনো বড় বিপর্যয় ঘটলে সরকার আর অজ্ঞতার অজুহাত দিতে পারবে না। একইভাবে, অ্যাভিগডর লিবারম্যান অভিযোগ করেন, অতীতের মতোই সরকার আবারও আগাম সতর্কবার্তা উপেক্ষা করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও তীব্র ভাষায় প্রশ্ন তোলেন, সরকার আসলে কীসের অপেক্ষায় আছে।
অন্যদিকে, বেনি গ্যান্টজের মতে, সরকার একদিকে যুদ্ধ জয়ের বড় বড় কথা বলছে, অন্যদিকে সেনা নিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে, যা একটি গুরুতর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করছে। সাবেক আইডিএফ প্রধান গাদি আইজেনকোট জোর দিয়ে বলেন, সবার জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু করা এখন নৈতিক ও জাতীয় দায়িত্ব।
রিজার্ভ বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অনেক নেতা সতর্ক করেছেন যে, একই ব্যক্তিদের বারবার ডেকে এনে দায়িত্ব দেওয়া তাদের মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাহিনীর কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামোর একটি মৌলিক দুর্বলতা সামনে এসেছে, যেখানে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, বিতর্কিত নীতি এবং জনবল ঘাটতি একত্রে একটি বড় ধরনের সংকটের ঝুঁকি তৈরি করছে।
/ইউএমএইচ