তেলের মানচিত্রে ক্ষমতার রাজনীতি

বাধন অধিকারী

আন্তর্জাতিক

মানচিত্রে আমরা সীমানা চিহ্নিত রাষ্ট্র দেখি। তবে এই দৃশ্যমান রেখাগুলোর নিচে আরেকটি অদৃশ্য মানচিত্র লুকিয়ে থাকে। সেই মানচিত্র আসলে তেলের।

2026-03-28T00:40:26+00:00
2026-03-28T00:59:02+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
তেলের মানচিত্রে ক্ষমতার রাজনীতি
বাধন অধিকারী
প্রকাশ: শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬, ১২:৪০ এএম  আপডেট: ২৮.০৩.২০২৬ ১২:৫৯ এএম
প্রতীকী ছবি
মানচিত্রে আমরা সীমানা চিহ্নিত রাষ্ট্র দেখি। তবে এই দৃশ্যমান রেখাগুলোর নিচে আরেকটি অদৃশ্য মানচিত্র লুকিয়ে থাকে। সেই মানচিত্র আসলে তেলের। এই মানচিত্রে দৃশ্যমান সীমান্ত না থাকলেও আছে প্রবাহ, পতাকার বদলে আছে পাইপলাইন। এই যখন বাস্তবতা, তখন যুদ্ধ তো কেবল ভূখণ্ড দখলের মামলা নয়, বরং শক্তির উৎস দখল এখানে গুরুত্বপূর্ণ উপজীব্য। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীরে এই তেল এমনভাবে প্রবাহিত হয় যে, একে যথার্থই বলা যায় রাষ্ট্রের ‘রক্তপ্রবাহ’। সে কারণে শিল্পপুঁজিবাদের উত্থানের যুগ থেকে তেলের মানচিত্রেই খেলা করে অদৃশ্য ক্ষমতা আর রাজনীতি।

শক্তির উৎস থেকে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ : তেল কেবল একটি জ্বালানি নয়, এটি আধুনিক সভ্যতার কেন্দ্রীয় শক্তি। শিল্পবিপ্লবের পরে যখন কয়লার জায়গা দখল করে তেল বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তখন থেকেই ক্ষমতার নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। পরিবহন, বিদ্যুৎ, কৃষি, যুদ্ধ- প্রতিটি ক্ষেত্রেই তেলের অপরিহার্যতা রাষ্ট্রগুলোর ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। 

বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এই সত্যটিকে নির্মমভাবে স্পষ্ট করে দেয়। জার্মানি ও জাপানের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল জ্বালানি ঘাটতি, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল তেল উৎপাদন তাকে সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির শীর্ষে পৌঁছে দেয়। যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশল যতই উন্নত হোক, জ্বালানি ছাড়া তা অচল; এই বাস্তবতা তখন থেকেই ভূরাজনীতির কেন্দ্রে স্থায়ী হয়ে যায়।

তেলের বৈশ্বিক অবকাঠামো কিংবা তিন স্তরের শক্তি : বিশ্বের তেল ব্যবস্থা মূলত তিনটি স্তরে কাজ করে- উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহন এবং বিপণন ও ব্যবহার।

প্রথম স্তরে রয়েছে উৎপাদন। সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান এবং ইরাক; এই দেশগুলোর হাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুদ। ফলে তাদের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব স্বাভাবিকভাবেই বেশি।

দ্বিতীয় স্তরে তেলকে অপরিশোধিত অবস্থা থেকে পরিশোধন করে ডিজেল, পেট্রোল, জেট ফুয়েলে রূপান্তর করা হয়। এই তেল পাইপলাইন বা ট্যাঙ্কার জাহাজের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিবাহিত হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কিছু কৌশলগত সমুদ্রপথ। এই যেমন হুরমুজ প্রণালি, যেখান দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়।
আরও পড়ুন

তৃতীয় স্তরে রয়েছে বিপণন ও ব্যবহার। শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, এমনকি প্লাস্টিক তৈরির মতো খাতগুলো সরাসরি তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেলের প্রবাহ থেমে গেলে পুরো অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়তে পারে।

উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ ও জোট রাজনীতি : তেলের বাজারে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অস্ত্র। ওপিইসি (অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ) নামের জোটটি উৎপাদন কমানো-বাড়ানোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে ওপিইসি+ গঠনের মাধ্যমে রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশ যুক্ত হওয়ায় এই নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়েছে। তবে এই একচেটিয়া প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শেল বিপ্লব। শেল তেল উৎপাদনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজারে নতুন ভারসাম্য তৈরি করেছে, যার ফলে ওপিইসির একক নিয়ন্ত্রণ কমেছে এবং তেলের বাজার আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

তেলের অর্থনীতিতে দাম, ডলার ও আধিপত্য :
তেলের দাম নির্ধারিত হয় মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে। চাহিদা ও জোগান, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মার্কিন ডলারের শক্তি। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড এবং ডব্লিউটিআই এই দুটি সূচক তেলের মূল মূল্যমান নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পেট্রোডলার ব্যবস্থা। তেল কেনাবেচা মূলত মার্কিন ডলারে হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিশেষ প্রভাব ধরে রাখতে পারে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য এখনও ডলারনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন প্রভাব অটুট রয়েছে এবং তেলের দামের ওঠানামা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। দামের ওঠানামা নিজেই একটি রাজনৈতিক অস্ত্র। দাম বাড়লে তেল আমদানিকারক দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর দাম কমলে উৎপাদক দেশগুলো অর্থনৈতিক চাপে পড়ে।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় তেল ঘিরে সংঘাত : তেলকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ইতিহাস দীর্ঘ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তেলের গুরুত্ব প্রথম উপলব্ধি করা হয়, যখন ব্রিটেন পারস্য অঞ্চলের তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তেল সরবরাহ যুদ্ধের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরপর ১৯৭৩ সালের তেল সংকট দেখিয়ে দেয়, তেল নিজেই একটি অস্ত্র হতে পারে- যখন আরব দেশগুলো পশ্চিমা বিশ্বের ওপর তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংঘাত ও তেলের দাম বৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত; ১৯৭৩, ১৯৭৯ ও ১৯৯০ সালের মন্দায় জ্বালানি মূল্য বড় ভূমিকা রেখেছিল।

বিশ্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল চেকপয়েন্ট হুরমুজ প্রণালি : বর্তমান বিশ্বে তেল রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক বিন্দু হলো হুরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই সরু জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। রয়টার্সের খবরে বলা হয়, এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়, ফলে এর কোনো বিঘ্ন সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ধাক্কা দেয়।

সাম্প্রতিক উত্তেজনায় তেলের নতুন বাস্তবতা : সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে উত্তেজনা আবারও তেলের ভূরাজনীতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক তেলের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ আটকে পড়েছে এবং বাজারে তেলের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।  বার্কলেজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে প্রতিদিন ১৩-১৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় জ্বালানি সংকট তৈরি করবে। 

আটলান্টিক কাউন্সিলের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সংঘাতের ফলে হুরমুজ দিয়ে ট্যাঙ্কার চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অভূতপূর্ব অস্থিরতা তৈরি করেছে।

যুদ্ধ মানেই জ্বালানি সংকট : আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এনার্জি ইন্টেলিজেন্সের বিশ্লেষক কলবি কনেলি বলেন, ‘হুরমুজ প্রণালি আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হলে স্বল্পমেয়াদেই তেলের দামে বড় ধাক্কা লাগবে।’ চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক ডেভিড বাটার এক প্রতিবেদনে বলেন, ইরান যুদ্ধ ইতিমধ্যেই উপসাগরীয় তেল রফতানিকারকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে এবং সংঘাত দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। ডেলয়েটের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইয়ান স্টুয়ার্ট দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘জ্বালানির দাম বৃদ্ধি প্রায়ই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস দেয়।’

‘নীরব যুদ্ধ’ থেকে সরাসরি প্রভাব : এই অঞ্চল এখন এক ধরনের ‘নীরব যুদ্ধক্ষেত্র’, যেখানে সংঘর্ষের সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি কূটনৈতিক চাপও সক্রিয়। দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কিছু জাহাজ চলাচল শুরু হলেও পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত এবং অনেক জাহাজ আটকে আছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া বক্তব্যে মার্কিন অর্থমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির দাম কমতে পারে, তবে বর্তমান অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

তেল ও জোটে নৈতিকতা বনাম বাস্তবতা : তেলের রাজনীতি শুধু সংঘাত সৃষ্টি করে না, এটি জোটও তৈরি করে। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক কিংবা রাশিয়ার সঙ্গে তেল উৎপাদক দেশগুলোর সমন্বয়- সবই দেখায় ভূরাজনীতির পেছনে প্রায়ই জ্বালানি সমীকরণ কাজ করে।

নবায়নযোগ্য শক্তির চ্যালেঞ্জ : বর্তমান বিশ্ব ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে এগোচ্ছে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, বৈদ্যুতিক যান; এসব প্রযুক্তি তেলের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তেলের বিকল্প শক্তি বাড়লেও বর্তমান সংঘাত প্রমাণ করছে বিশ্ব এখনও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য তেলের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।

সম্ভবত ভবিষ্যতের বিশ্বে তেলের গুরুত্ব কিছুটা কমবে। কিন্তু ক্ষমতার লড়াই থামবে না, শুধু তার রূপ বদলাবে।

এএডি/


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: