দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশুদের মধ্যে হাম সংক্রমণ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। যদিও এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ, তবুও আক্রান্ত হলে শিশুদের ক্ষেত্রে গুরুতর জটিলতা এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তবে সময়মতো টিকা নিলে এই রোগ থেকে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ডা. লুৎফুন্নেসা জানান, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক বায়ুবাহিত রোগ। এটি মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, হামের সংক্রমণ ক্ষমতা কোভিড-১৯-এর চেয়েও বেশি। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই ১২ থেকে ১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে শিশুদের প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার হার ৯০ শতাংশের বেশি হলেও দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই অবহেলা করেন। সাধারণত ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ দেওয়ার পর ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক অভিভাবক তা ভুলে যান। বিশেষ করে মায়েদের পরবর্তী গর্ভধারণের কারণে আগের সন্তানের টিকার বিষয়টি অনেক সময় গুরুত্ব হারায়।
চিকিৎসার বিষয়ে তিনি বলেন, হামের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। মূলত রোগের ফলে যেসব জটিলতা দেখা দেয়, সেগুলোর চিকিৎসাই দেওয়া হয়। এই রোগের কারণে শিশুদের নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের সংক্রমণ) ইত্যাদি মারাত্মক সমস্যা হতে পারে। এছাড়া চোখের কর্নিয়া শুকিয়ে যাওয়া বা আলসার হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। এ অবস্থায় উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ এবং চোখের জন্য বিশেষ মলম ব্যবহার করা হয়। যদি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ যুক্ত হয়, তাহলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে।
ডা. লুৎফুন্নেসা জানান, নবজাতক শিশুরা সাধারণত মায়ের শরীর থেকে প্রাপ্ত অ্যান্টিবডির মাধ্যমে জন্মের পর প্রায় ৯ মাস পর্যন্ত সুরক্ষা পায়। এজন্যই বাংলাদেশে ৯ মাস বয়সে প্রথম এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে কিছু এলাকায় কুসংস্কারের কারণে এখনো টিকা নেওয়ার প্রবণতা কম। এসব ছোট ছোট গোষ্ঠী বা “পকেট কমিউনিটি” সংক্রমণ ছড়ানোর বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে এবং ভবিষ্যতে মহামারি সৃষ্টি করতে পারে।
হামের লক্ষণ
হাম মূলত শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং গলা ব্যথা দেখা যায়। কিছুদিন পর শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ ওঠে, যা সাধারণত কপাল থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
সম্ভাব্য জটিলতা
হাম হলে অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এই রোগের কারণে কানে সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস এবং গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
প্রতিরোধের উপায়
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এমএমআর টিকা গ্রহণ করা। কোনো শিশু আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
টিকার নিরাপত্তা
হামের টিকা অত্যন্ত নিরাপদ। সাধারণত এর কোনো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। কখনো কখনো হালকা জ্বর বা টিকা দেওয়ার স্থানে সামান্য ব্যথা হতে পারে, যা স্বাভাবিক। গুরুতর অ্যালার্জির ঝুঁকি খুবই কম।
টিকা দিতে দেরি হলে করণীয়
যদি কোনো কারণে শিশুকে সময়মতো টিকা দেওয়া না হয়, তাহলে দেরি হলেও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে টিকা সম্পন্ন করা উচিত। কারণ টিকাই এই রোগ থেকে সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
/ইউএমএইচ