ভ্রমণের সময় মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা অস্বস্তি—এসব সমস্যায় ভোগেন অনেকেই। বিশেষ করে বাস, ট্রেন বা নৌযানে চলার সময় যদি গতির বিপরীত দিকে মুখ করে বসা হয়, তাহলে এই উপসর্গগুলো আরও তীব্র হয়ে ওঠে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে ‘মোশন সিকনেস’ বলা হয়।
মস্তিষ্কে সংকেতের দ্বন্দ্বই মূল কারণ
চিকিৎসকরা বলছেন, মানুষের শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করে—চোখ (দৃষ্টিশক্তি), ভেতরের কান (ভেস্টিবুলার সিস্টেম) এবং স্নায়ুতন্ত্র। এই তিনটি অংশ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সমন্বয়ের মাধ্যমেই মস্তিষ্ক বুঝতে পারে শরীরের অবস্থান ও গতি।
কিন্তু চলন্ত যানবাহনে গতির বিপরীত দিকে বসলে এই সমন্বয়ে সমস্যা তৈরি হয়। চোখ দেখে বাইরের দৃশ্য দ্রুত সরে যাচ্ছে, যা সামনে এগোনোর ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, ভেতরের কান অনুভব করে শরীরের ভিন্ন অবস্থান। আবার শরীরের পেশি ও জয়েন্ট থেকে আসা সংকেত জানায় আপনি স্থির হয়ে বসে আছেন। এই ভিন্ন ভিন্ন সংকেত একসঙ্গে মস্তিষ্কে পৌঁছালে তা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই অবস্থাকে ‘সেন্সরি কনফ্লিক্ট’ বলা হয়, যা ‘মোশন সিকনেসের’ প্রধান কারণ।
কেন বমি বমি লাগে?
গবেষকদের মতে, মস্তিষ্ক এই অস্বাভাবিক সংকেতকে অনেক সময় বিষক্রিয়ার মতো পরিস্থিতি মনে করে। ফলে শরীর প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বমির প্রবণতা তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মাথা ঘোরা, ঠান্ডা ঘাম, ক্লান্তি এবং কখনও মাথাব্যথা।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
বিশেষজ্ঞরা জানান, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। যেমন—
২ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু
গর্ভবতী নারী
মাইগ্রেনে আক্রান্ত ব্যক্তি
যাদের ভেতরের কানের ভারসাম্য ব্যবস্থা বেশি সংবেদনশীল
দীর্ঘ সময় ভ্রমণে অভ্যস্ত নন এমন ব্যক্তি
প্রতিরোধে কী করবেন?
মোশন সিকনেস প্রতিরোধে কিছু কার্যকর পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা—
সঠিক আসন নির্বাচন : সম্ভব হলে যানবাহনের গতির দিকে মুখ করে বসুন। বাসের সামনের দিক, ট্রেনের ইঞ্জিনমুখী সিট বা বিমানের ডানার কাছাকাছি আসন তুলনামূলক স্থিতিশীল।
দূরের দিকে তাকান : জানালার বাইরে দূরের স্থির বস্তুর দিকে তাকালে চোখ ও কানের সংকেতের মধ্যে সামঞ্জস্য আসে।
স্ক্রিন এড়িয়ে চলুন : মোবাইল বা বই পড়া সমস্যা বাড়াতে পারে।
পর্যাপ্ত বাতাস : জানালা খুলে বা ভালো ভেন্টিলেশনে থাকুন।
খাবারে সতর্কতা : ভ্রমণের আগে হালকা খাবার খান, অতিরিক্ত তৈলাক্ত বা মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।
গন্ধ থেকে দূরে থাকুন : তীব্র পারফিউম বা ধোঁয়া সমস্যা বাড়াতে পারে।
ওষুধ ও ঘরোয়া উপায়
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভ্রমণের আগে বমি প্রতিরোধী ওষুধ গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি আদা, লবঙ্গ বা লেবুর মতো প্রাকৃতিক উপাদান অনেকের ক্ষেত্রে উপকারী প্রমাণিত হয়।
সাময়িক হলেও অবহেলা নয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘মোশন সিকনেস’ কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগ নয়, বরং এটি শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তবে যাদের ক্ষেত্রে সমস্যা ঘন ঘন বা তীব্র আকারে দেখা দেয়, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সচেতনতা, সঠিক আসন নির্বাচন এবং কিছু সহজ অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এই সমস্যাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ফলে ভ্রমণ হতে পারে আরও আরামদায়ক ও উপভোগ্য।
/ইউএমএইচ