দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে অন্তত সাতটি জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং চলতি মাসেই হামে আক্রান্ত হয়ে ২১ জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ, শিশু বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি এক গণমাধ্যম বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে জানান, বর্তমান পরিস্থিতি “উদ্বেগজনক” এবং দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এটি আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।
হাম কী এবং কেন এটি বিপজ্জনক
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মূলত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়—আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস সহজেই অন্যের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন আক্রান্ত শিশু গড়ে ১৫–১৮ জন পর্যন্ত অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে, যা এর সংক্রমণ ক্ষমতার তীব্রতা নির্দেশ করে।
শিশুরা এ রোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
কীভাবে চিনবেন হাম
হামের লক্ষণ সাধারণত ধাপে ধাপে প্রকাশ পায়—
শুরুতে জ্বর (প্রায়ই উচ্চমাত্রার)
সর্দি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া
চোখ লাল হয়ে যাওয়া
কয়েকদিন পর মুখে ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি
ফুসকুড়ি ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে
মুখে ঘা বা সাদা দাগ দেখা যেতে পারে
জটিলতা
অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি বৃদ্ধি এবং গুরুতর অবস্থায় মৃত্যুও ঘটতে পারে। বর্তমানে অনেক শিশুকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নিতে হচ্ছে।
কেন হঠাৎ প্রাদুর্ভাব বাড়ল
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে—
টিকাদানে ঘাটতি
হামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অন্তত ৯০% শিশুকে টিকার আওতায় আনা জরুরি (হার্ড ইমিউনিটি)। বাংলাদেশে সাধারণত ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনেক শিশু সময়মতো টিকা পায়নি, ফলে একটি বড় অংশ ঝুঁকিতে থেকে গেছে।
ক্যাম্পেইন দুর্বল হয়ে পড়া
টিকাদানের নিয়মিত কর্মসূচির পাশাপাশি “ডোর-টু-ডোর” ক্যাম্পেইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে—
পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব
স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি
মাঠপর্যায়ে তৎপরতা কমে যাওয়া
অপুষ্টি
বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় অপুষ্টির হার বেশি হওয়ায় সেখানে শিশুরা দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছে এবং জটিলতাও বেশি হচ্ছে।
টিকার সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে ৬ মাস বয়সী শিশুর মধ্যেও হাম দেখা যাচ্ছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, মায়ের কাছ থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ৯ মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকছে না। ফলে টিকার সময়সীমা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে।
সংক্রমণের উৎস
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বছরের শুরুতে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে সংক্রমণ বাড়ার পর সেখান থেকে দেশের অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বিষয়টি এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
পরিস্থিতির নতুন দিক
আগে হামের প্রাদুর্ভাব প্রধানত দুর্গম এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন এটি—
জেলা শহর
এমনকি নগর এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে
ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
নিয়ন্ত্রণে কী করা জরুরি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন—
দ্রুত গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা
টিকা বঞ্চিত শিশুদের চিহ্নিত করা
আক্রান্তদের আইসোলেশনে রাখা
হাসপাতাল ও টিকাদান কেন্দ্রে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো
অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি
অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
নির্ধারিত সময়ে শিশুকে টিকা দিন
জ্বর ও ফুসকুড়ি দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান
আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখুন
পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করুন
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সতর্কবার্তা হলেও এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। তবে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এটি বড় আকারের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। টিকাদান জোরদার ও সচেতনতা বৃদ্ধিই এ পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রধান উপায়।
/ইউএমএইচ