মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব ও ইরানের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব কেবল ধর্মীয় বিভাজনে সীমাবদ্ধ নয় বরং আঞ্চলিক আধিপত্য, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও নিরাপত্তা রাজনীতির জটিল সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব নিজেকে সুন্নি ইসলামের নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, অন্যদিকে ইরান নিজেকে শিয়া শক্তির কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরছে। এই ধর্মীয় বিভাজনকে দুই দেশই রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এই দ্বন্দ্বের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ‘প্রক্সি যুদ্ধের’ মাধ্যমে।
ইরান সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে প্রভাব বিস্তার করছে। এর মধ্যে রয়েছে হিজবুল্লাহ ও হুথি আন্দোলন। অন্যদিকে সৌদি আরব এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পাল্টা তৎপরতা চালাচ্ছে।
এই পরোক্ষ সংঘাত চলছে ইয়েমেন, সিরিয়া, লেবানন ও ইরাকে, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই দ্বন্দ্ব গুরুত্বপূর্ণ।
উভয় দেশই তেলসমৃদ্ধ হওয়ায় জ্বালানি বাজারে প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই পথ দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবাহিত হয়। ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই প্রণালি সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য কৌশলগত চাপ তৈরি করে।
এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার চেষ্টা হলেও সৌদি আরব ও ইসরায়েল এই চুক্তিকে যথেষ্ট নিরাপদ মনে করেনি। ফলে বিষয়টি এখনো আঞ্চলিক নিরাপত্তার বড় ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।
বৈশ্বিক শক্তির ভূমিকাও এই দ্বন্দ্বকে জটিল করেছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবকে সমর্থন দিয়ে আসছে। অন্যদিকে চীন মধ্যস্থতার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব-ইরান দ্বন্দ্ব কেবল সামরিক সংঘাত নয়, এটি কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বহুমাত্রিক রূপ। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতদিন চলবে, ততদিন মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা অনিশ্চয়তার মধ্যেই থাকবে।