ক্ষমতায় আসার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে আর নতুন যুদ্ধে জড়াবেন না। নিজেকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে তুলে ধরে এমনকি শান্তিতে অবদানের দাবিও করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
বিকল্প ধারার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ইন্টারসেপ্ট-এর এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ট্রাম্পের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়েছে অন্তত ২০টির বেশি সামরিক হস্তক্ষেপ, সংঘাত ও যুদ্ধে; যার বড় অংশই অঘোষিত, গোপন বা আংশিকভাবে স্বীকৃত।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নিজেকে ‘যুদ্ধবিরোধী’ নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
তিনি দাবি করেছিলেন, পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলো অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে ফেলেছে এবং তিনি সেই ধারার পরিবর্তন ঘটাবেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো নতুন যুদ্ধে যাবে না। কিন্তু ইন্টারসেপ্ট-এর বিশ্লেষণ এই দাবিকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এতে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা না করলেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রকে ধারাবাহিক সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে রেখেছে। শুধু বড় যুদ্ধ নয়, ছোট ছোট সামরিক অভিযান, ড্রোন হামলা, বিশেষ বাহিনীর গোপন মিশন সব মিলিয়ে একটি ‘চলমান যুদ্ধ বাস্তবতা’ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি নতুন ধরনের যুদ্ধনীতি; যেখানে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই কিন্তু যুদ্ধের সব উপাদান উপস্থিত। এতে রাজনৈতিক দায় কম থাকে কিন্তু সামরিক কার্যক্রম চলতেই থাকে। ফলে জনগণের সামনে শান্তির বার্তা দেওয়া সম্ভব হয় আবার পর্দার আড়ালে যুদ্ধও চালানো যায়।
কোথায় কোথায় এই হস্তক্ষেপ : ইন্টারসেপ্ট-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে অন্তত ২০টির বেশি দেশে। এর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইরান, ইয়েমেন, লিবিয়া, সোমালিয়া, নাইজার, মালি, ক্যামেরুন, মিশর, তিউনিসিয়া, লেবানন, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, ভেনেজুয়েলা এবং আরও কয়েকটি অঞ্চল।
এই তালিকা শুধু সংখ্যার দিক থেকে বড় নয়, ভৌগোলিক দিক থেকেও বিস্তৃত। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা সবখানেই মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দেখা গেছে। এমনকি ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের জলসীমাতেও হামলার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের বিস্তৃত সামরিক সম্পৃক্ততা দেখায় যে যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘গ্লোবাল কনফ্লিক্ট নেটওয়ার্ক’-এর মধ্যে কাজ করছে। যেখানে নির্দিষ্ট কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নেই বরং বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট সংঘাতের মাধ্যমে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা হচ্ছে।
কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে যুদ্ধ : যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন একাধিক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সামরিক অভিযান চালিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু আইনি প্রশ্ন নয়, গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্নও। কারণ কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ মানে জনগণের প্রতিনিধিদের মতামত উপেক্ষা করা।
এই প্রবণতা নতুন নয়, তবে ট্রাম্প আমলে এটি আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। প্রশাসন ‘সামরিক অভিযান’ বা ‘সীমিত পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করে অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন এড়িয়ে গেছে। ফলে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক্রমেই নির্বাহী শাখার হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
গোপন আইন ও ছায়াযুদ্ধ : ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক কৌশলের একটি বড় অংশ নির্ভর করেছে গোপন আইনি কাঠামোর ওপর। ‘১২৭ই’ নামে পরিচিত একটি বিধান বিদেশি বাহিনীকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে যুদ্ধ করার সুযোগ দেয়। এই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে স্থানীয় বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে তাদের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কম দেখালেও বাস্তবে তার প্রভাব থেকে যায়।
এ ‘অভিযান’র নামে ট্রাম্পের গোপন যুদ্ধজাল ছাড়া গোপন অভিযানের আইনের মাধ্যমে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও সরাসরি সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ছায়াযুদ্ধের ফলে যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যায় এবং জবাবদিহি কমে যায়।
ট্রাম্প প্রশাসন একাধিকবার সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ না বলে ‘সামরিক অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতে এই শব্দচয়ন দেখা গেছে। সমালোচকদের মতে, এটি একটি কৌশল; যাতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
বাস্তবে সৈন্য মোতায়েন, বিমান হামলা, নৌবাহিনীর উপস্থিতি সবই যুদ্ধের বৈশিষ্ট্য বহন করে। তবু ভাষাগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এর রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের ৮০টির বেশি দেশে মার্কিন বিশেষ বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। তারা বিভিন্ন ধরনের অভিযানে অংশ নিচ্ছে, কখনো সরাসরি, কখনো স্থানীয় বাহিনীর সঙ্গে। এই উপস্থিতি দেখায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম কতটা বিস্তৃত এবং জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের বিস্তৃত উপস্থিতি একদিকে কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখতে সাহায্য করে, অন্যদিকে সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়ায়।
ট্রাম্প আমলে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নাইজেরিয়া থেকে সোমালিয়া পর্যন্ত বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইরানে, সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। সেখানে বেসামরিক হতাহতের অভিযোগও উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার বদলে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।