মশায় নাকাল হয়ে পড়েছে নগরবাসী। রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মশা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)-ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) মশা নিধনের নানা উদ্যোগ নিলেও কোনোভাবেই মশা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। ফলে মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী। অবশ্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, মশক নিধন কার্যক্রম চলমান থাকায় মশা কমে আসছে।
কিন্তু সংস্থা দুটি রাজধানীর অলিগলিতে মশা নিধনের ওষুধ প্রয়োগ করলেও সেটি কতটুকু কাজে আসছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে ডিএনসিসি-ডিএসসিসি ও সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, মশক নিধনে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মশার ওষুধ ঠিকমতো কাজ করছে কি না, সেটি নিয়েও গবেষণা চলছে। গবেষণা টিম কাজ করছে। বৃষ্টির কারণে কিউলিক্স মশা কিছুটা কমছে। ইতিমধ্যে মশা নিধনে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ক্রাস প্রোগ্রাম শেষ হয়েছে।
ডিএসসিসি বলছে, ইতিমধ্যে খালগুলোর চার্ট করা হয়েছে। কোনটি সরকারি বা বেসরকারি খাল। এর মধ্যে কোথাও আছে বিআইডব্লিউটিএ অথবা কোথাও ওয়াসার। তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। যেখানে ব্যক্তি মালিকানাধীন খাল আছে তাদেরও চিঠি দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ সেটি চিহ্নিত করা হয়েছে। দুয়েকটি ওয়ার্ড ছাড়া বেশিরভাগ ওয়ার্ডে মশার উপদ্রব কমছে। সামনে ডেঙ্গু আসতে পারে তাই প্রিপারেশন নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ট্রেনিং প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া হয়েছে।
চলতি মাস এপ্রিলের ৭, ৮, ৯ ও ১২-১৩ তারিখে ট্রেনিং প্রোগ্রাম চলমান থাকবে। অবশ্য মশা নিধনে জনবলের ঘাটতি রয়েছে। তারপর মশক নিধনের স্বেচ্ছাসেবী কর্মীদের একটি রিজার্ভ ফোর্স রয়েছে। সেখান থেকে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে মশক নিধন অধিদফতরের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে ডেঙ্গুর সময়কালেই মশা বা ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা সম্ভব হবে।
ডিএনসিসি বলছে, রাজধানীসহ সারা দেশে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। জলপথ ও স্থলপথ দুই দিক থেকেই একযোগে মশক নিধন অভিযান শুরু হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিউলেক্স মশার উপদ্রব কিছুটা কমেছে। তবে এপ্রিল থেকে সাধারণত শুরু হয় ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ।
এ জন্য মাঠ পর্যায়ে ছিটানো ওষুধের মান যাচাইয়ে স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষার মাধ্যমে কার্যকারিতা নিশ্চিত হওয়ার পর পুরোদমে স্প্রে কার্যক্রম শুরু হবে। স্প্রে এমনভাবে করা হবে যাতে ওষুধ সরাসরি মশার গায়ে পৌঁছায়।
সমন্বিত অ্যাকশন প্ল্যানের আওতায় খাল, ড্রেন ও জলাশয়ে স্প্রে কার্যক্রম জোরদার করা হবে। স্থলপথে ফগার মেশিন ও অন্যান্য উপায়ে লার্ভা ও প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিধনের কাজ চলবে। টবের পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, জমে থাকা পানি, এসবই এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র। নগরবাসীকে বাসাবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এলাকায় ওষুধ ছিটানো কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে এসব এলাকার ভুক্তভোগীরা বলছেন, মশার ওষুধ ছিটানো হলেও উপদ্রব কোনোভাবেই কমছে না। বাসাবাড়িতে দিনের বেলায়ও মশার কামড় খেতে হয়। আর রাত হলেও তো কথাই নেই। রাত যত গভীর হয়, মশার উপদ্রব ততটাই বাড়তে থাকে। মশারি টাঙিয়েও নিস্তার পাওয়া যায় না। মশার লার্ভা ধ্বংস করতে সকালে টেমিফস নামের একটি ওষুধ স্প্র্রে (ছিটানো) করা হয়, যা ভারত থেকে আমদানি করা।
আর বিকালে উড়ন্ত মশা মারতে মেলাথিউন নামের ওষুধ দিয়ে ফগিং (ধোঁয়া ছড়ানো) করা হয়, যা চীন থেকে আনা। সিটি করপোরেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা সকাল-বিকাল দুই ধাপে প্রতিটি ওয়ার্ডে মশা নিধনের কাজ করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিএনসিসি-ডিএসসিসির পক্ষ থেকে মশার যে ওষুধ ছিটানো হয়, তা কাজে আসছে কি না তা নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
রাজধানী ঢাকায় মশার উপদ্রব থামানো না গেলে নগরবাসীর জীবন তা আরও অতিষ্ঠ করে তুলবে। অথচ দুই সিটি করপোরেশন মশক নিধনের প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ রাখে। কিন্তু এডিস মশার সঙ্গে কিউলেক্স নগরবাসীর জন্য এখন আতঙ্কের নাম। অবশ্য মার্চের শেষ দিকে বৃষ্টি হওয়ার কারণে কিউলিক্স মশা কিছুটা কমেছে। কারণ কিউলিক্স মশা আকারে ছোট হওয়ায় সামান্য ঝড় বা বৃষ্টিতে সহজে মারা যায়। একই সঙ্গে প্রজনন ক্ষমতা কমে যায়। তবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি করপোরেশনকে আরও কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। সাধারণক এপ্রিল মাস থেকেই এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।
তারা বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত তিন প্রজাতির মশার বিস্তার দেখা যায়, কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস। এর মধ্যে কিউলেক্সের বিস্তারই বেশি। কিউলেক্সের কামড়ে ফাইলেরিয়া বা গোদরোগ ও জাপানি এনসেফালাইটিস হয়। তবে এ দুটি রোগ দেশে ততটা প্রকট নয়। এডিসের কামড়ে ডেঙ্গু ও অ্যানোফিলিসের কামড়ে ম্যালেরিয়া হয়। এ জন্য ঢাকা উত্তর-
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর তদারকি, ওষুধের মান যাচাই এবং মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। শুধু ধোঁয়া বা ফগিং দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ফগিং মূলত পূর্ণবয়স্ক মশা কমাতে কার্যকর হলেও লার্ভা ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
নির্মাণাধীন ভবন, ছাদে জমে থাকা পানি, খোলা ড্রেন ও জলাবদ্ধ জায়গাগুলোয় নিয়মিত নজরদারি না থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। তবে যেটি করা হচ্ছে, এভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। গত কয়েক বছরে রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মশা নিধনে শুধু মৌসুমি ও লোকদেখানো অভিযান নয়, বছরব্যাপী সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষ করে ওয়ার্ডভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, নিয়মিত তদারকি এবং মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি জোরদার করা দরকার।
এডিসের সঙ্গে গত বছরের ডিসেম্বরে ঢাকায় সংগৃহীত প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৮৫ শতাংশই ছিল কিউলেক্স প্রজাতির। গত বছরজুড়ে প্রতিদিনই কোনো কোনো এলাকায় এডিস মশার কামড়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এপ্রিল মাসেই ভয়ংকর রূপ নিতে পারে এডিস মশার উপদ্রব। এতে বাড়বে ডেঙ্গু রোগী। ফলে কার্যকর ব্যবস্থা এখনই নিতে হবে। সেটি না হলে মশাবাহিত রোগে নগরবাসীকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হবে। তবে মশা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হলে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে মশার উপদ্রব মোকাবিলায় জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র বলছে, চলতি বছরের ৩০ মার্চ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৮১৬ জন। এর মধ্যে ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ ও ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী। এই বছর চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া এ পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৭২৪ জন। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে মোট ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় মোট ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের তুলনায় চলতি ফেব্রুয়ারিতে মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। আর মশার ৯০ শতাংশই কিউলেক্স। মার্চে মশার পরিমাণ প্রথমদিকে বাড়লেও শেষের দিকে কিছুটা কমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় সংগৃহীত পানিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া গেছে। ফেব্রুয়ারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ১ হাজার ২৫০-এ।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সেগুনবাগিচা এলাকার বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, সেগুনবাগিচা এলাকায় বিগত বছরগুলোতে মশা খুব কম ছিল। কিন্তু এ বছর শীতকাল থেকেই মশার জন্য ঘুমানো যাচ্ছে না। তবে গত কয়েক দিন ধরে একটু মশা কমছে। তবে এখন আবার বৃষ্টি শুরু হবে। এই সময়ে ডেঙ্গু রোগ বেড়ে যায়। মাঝে মধ্যে দেখি ওষুধ ছিটানো হয়। কিন্তু মশা তো কমে না। তাই সিটি করপোরেশনকে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. ইমদাদুল হক বলেন, ইতিমধ্যে মশার উপদ্রব কিছুটা কমে এসেছে। কিউলেক্স মশা বৃষ্টির কারণে কমে এসেছে। সামনে এডিস মশার উপদ্রব দেখা দিতে পারে। সেটি মোকাবিলায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মশক নিধনে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
এরই মধ্যে ৫৩৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ক্লিন স্কুল, নো মসকিউটো’ শিরোনামে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। ড্রেনেজ, সুয়ারেজ, লেক ও খালগুলো পরিচ্ছন্ন কর্মসূচি চলমান রয়েছে। অবশ্য জনবল সংকট থাকলেও মশার ওষুধ ছিটানো কার্যক্রম বন্ধ নেই। অনেক এলাকায় খোলা নর্দমা, স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট স্থান না থাকার মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। এতে মশার বংশবিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের কার্যক্রম চলমান।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, মশক নিধনের কার্যক্রম চলমান। সম্প্রতি বৃষ্টি হওয়ার কারণে কিউলেক্স মশার উপদ্রব অনেকটা কমেছে। সামনে ডেঙ্গু মশার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সময়ে এডিস মশা বেড়ে যায়। সে কারণে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই মশক নিধন কার্যক্রম শুরু হবে। তবে আমাদের কিছু জনবল ঘাটতি রয়েছে। অবশ্য জনবল ঘাটতি থাকলে মশক নিধন অধিদফতরের কিছু স্বেচ্ছাসেবী রয়েছেন, তাদের আমরা কাজে লাগানোর জন্য ইতিামধ্যে চিঠি দিয়েছি। আশা করছি আমরা মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠা নগরবাসীকে যন্ত্রণা থেকে রেহাই দিতে পারব। এ ছাড়া গত ১ মার্চ থেকে ল্যাবে সার্ভে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি দুয়েকটি ওয়ার্ড ছাড়া বাকি এলাকায় মাশার উপদ্রব কমেছে। কোথাও কোথাও মশার প্রজনন ও উপদ্রব বেশি হচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে তা নিয়ে গবেষণা চলছে। এসব কারণ চিহ্নিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।