সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাটের শরণখোলাসহ বিভিন্ন গ্রামে একের পর এক ধরা পড়ছে বিশাল আকৃতির অজগরসহ নানা প্রজাতির বিষধর ও নির্বিষ সাপ। গত ২০ দিনে এসব এলাকা থেকে অন্তত ১০টি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। অধিকাংশ সাপই মিলছে বসতঘর, মাছের ঘের, হাঁস-মুরগির খোপ ও ধানখেতে। লোকালয়ে ঘন ঘন সাপের উপস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দিন দিন আতঙ্ক বাড়ছে।
সর্বশেষ শনিবার (১৮ জুলাই) সকালে শরণখোলা উপজেলার বকুলতলা গ্রামের আব্দুর রহমানের বাড়ি থেকে প্রায় ৮ ফুট দীর্ঘ একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। পরে সেটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করেছে বন বিভাগ। বন্যপ্রাণী ও পরিবেশকর্মীরা জানিয়েছেন, চলতি জুলাই মাসের ২ তারিখ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা থেকে এই ১০টি সাপ উদ্ধার করা হয়।
পরিবেশবাদী ও বন্যপ্রাণী গবেষকদের মতে, মানুষের ওপর আক্রমণের উদ্দেশ্যে নয়, মূলত খাবারের সন্ধানে ও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সাপগুলো লোকালয়ে চলে আসছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কর্মরত সংস্থা ‘ওয়াইল্ড টিম’-এর শরণখোলা ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর মো. আলম হাওলাদার জানান, চলতি মাসে উদ্ধার হওয়া ১০টি সাপের মধ্যে ৮ থেকে ১২ ফুট দৈর্ঘ্যের অজগরই রয়েছে সাতটি। এছাড়া ৫ ফুটের একটি পদ্মগোখরো (খৈয়া গোখরো), ২ ফুটের একটি কালনাগিনি এবং ৩ ফুটের একটি নির্বিষ ডোরা সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া প্রতিটি সাপই বন বিভাগের সহায়তায় সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর শরীফ ও আব্দুর রহমান উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলেন, আগে গ্রামে এত সাপ আসতে দেখা যায়নি। এখন প্রায়ই সাপ উদ্ধারের খবর মিলছে। বিশাল বিশাল অজগর আস্ত ছাগল, হাঁস-মুরগি গিলে খাচ্ছে। বাড়ির শিশু এবং গৃহপালিত পশুপাখির নিরাপত্তা নিয়ে আমরা চরম চিন্তায় আছি।
লোকালয়ে সাপ আসার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’ সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী মো. নূর আলম শেখ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ফলে বন্যপ্রাণিদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, দেখা দিচ্ছে তীব্র খাদ্য সংকট এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল। মূলত বেঁচে থাকার তাগিদেই সাপ লোকালয়ে চলে আসছে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপের গুরুত্ব তুলে ধরে এই পরিবেশবাদী নেতা বলেন, সাপ না মেরে নিরাপদে তাদের আবাসস্থলে ফিরিয়ে দিতে হবে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে বন বিভাগের আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) শরীফুল ইসলাম বলেন, বর্ষা মৌসুমে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় সাপের উপদ্রব কিছুটা বেড়ে যায়। বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে বনের নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ায় সাপ নিরাপদ আশ্রয় ও খাবারের খোঁজে লোকালয়ে চলে আসে। তবে আশার কথা হল, মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। আগে মানুষ সাপ দেখলেই পিটিয়ে মেরে ফেলত, আর এখন তারা সাপ না মেরে বন বিভাগ বা প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীদের খবর দেয়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বন্যপ্রাণী বাঁচাতে সবাইকে এভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
সময়ের আলো/জোই