কুষ্টিয়া জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ৯০ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) পর্যন্ত ভর্তি হওয়া এসব শিশু জেলার পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এ ছাড়া চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৮৮ দিনে জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৩ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। তবে কোনো শিশু মারা যায়নি।
বুধবার (১ এপ্রিল) কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার নাসরিন আক্তার এই তথ্য জানান।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত তিন সপ্তাহ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু রোগীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে। বর্তমানে ১৯ জন রোগী ভর্তি আছে।
মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের ২০ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে শতাধিক রোগীতে ঠাসা। ওয়ার্ডের কক্ষ পূর্ণ হয়ে বারান্দায় রাখা হয়েছে শিশু রোগীদের। হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের আলাদাভাবে দোতলার একটি ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। সেখানেও বিছানার ঘাটতি। কয়েকটি বিছানায় দুজন করে শিশু রাখা হয়েছে। অধিকাংশ শিশুই জ্বর, ঠান্ডা, কাশি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত। শরীরে ফোটা ফোটা র্যাশও রয়েছে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতাল থেকে কোনো প্রকার ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি সিরিঞ্জসহ অক্সিজেন দেওয়ার পানি ও নল যাবতীয় সব কিছু বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। সারাদিনে একবার চিকিৎসক রাউন্ডে আসেন।
হামে আক্রান্ত তিন মাস বয়সি মেয়ে ফারিয়া খাতুনকে নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় বসে ছিলেন মা মিতু খাতুন। তার বাড়ি সদর উপজেলার ঝাউদিয়া গ্রামে। শনিবার মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করান। তিনি জানান, তার নিজেরও ঠান্ডা জ্বর ছিল। এরপর মেয়ের প্রচণ্ড জ্বর আসে। গায়ে র্যাশ দেখা দেয় প্রচুর। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল। বেসরকারিভাবে এক চিকিৎসককে দেখানো পর তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করা হয়। এখন শ্বাসকষ্ট কমেছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ১২ টাকা খরচ হচ্ছে। জ্বরের সিরাপ পর্যন্ত বাইরে থেকে কেনা লাগছে। ২৪ ঘণ্টায় একবার শুধু বেলা ১১টার দিকে ডাক্তার আসছে।
একই অভিযোগ সদর উপজেলার আলামপুর গ্রাম থেকে তিন মাস বয়সি সন্তান ওরহানকে নিয়ে আসা নাজনীন আক্তারেরও।
ওষুধসহ যে সব বিষয়ে রোগীর স্বজনেরা অভিযোগ জানাচ্ছে সে ব্যাপারে জানতে চাইলে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নার্স কামরুন্নাহার বলেন, পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। স্টোর কক্ষের কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে। কোনো কিছু পাওয়া যাচ্ছে না।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম বলেন, হামে আক্রান্ত রোগী ১৯ জন ভর্তি আছে। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে অক্সিজেন সাপোর্ট রয়েছে। তবে কোনো ভেন্টিলেশন সাপোর্ট নাই। তিনজন রোগী একটু গুরুতর আছে। তিনজন চিকিৎসক ও তিনজন নার্সের তত্ত্বাবধানে রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের বাইরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও হামে আক্রান্ত রোগী আসছে। এসব হাসপাতালেও হামে আক্রান্ত রোগীদের জন্য পৃথক ‘হাম আইসোলেশন কর্নার’ খোলা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে জেলায় ১৫জন রোগী ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে দুজন পজেটিভ। ফেব্রুয়ারি মাসে ২০ জন ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে পজেটিভ ছিল ২ জন। মার্চ মাসের ২৯ দিনে রোগী ভর্তি হয় ১২৮ জন। তাদের মধ্যে ১১জন পজেটিভ রোগী। মোট ১৫ জন রোগী পজেটিভ শনাক্ত হয়। আর গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ৯০ জন শিশু।
কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, জেনারেল হাসপাতালের বাইরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে আক্রান্ত শিশু আসছে। রোগী বাড়তির দিকে যাচ্ছে। সব হাসপাতালে পৃথক ‘হাম আইসোলেশন কর্নার’ করা হয়েছে। হামে আক্রান্ত শিশুদের বিশেষ নজরদারিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সভা করে আরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সময়ের আলো/জোই