নড়াইলের বিলে নির্বিচারে শামুক নিধন, কমছে অতিথি পাখি ও হুমকিতে জলজ জীববৈচিত্র্য

মোস্তফা কামাল, নড়াইল

সারাদেশ

নড়াইলের বিলগুলোতে একসময় শামুকের প্রচুর উপস্থিতি ছিল। বর্ষা ও শীত মৌসুমে বিলের পানি, কাদা ও জলজ উদ্ভিদের আশপাশে অসংখ্য শামুক

2026-09-13T12:23:37+00:00
2026-09-13T12:23:37+00:00
 
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
নড়াইলের বিলে নির্বিচারে শামুক নিধন, কমছে অতিথি পাখি ও হুমকিতে জলজ জীববৈচিত্র্য
মোস্তফা কামাল, নড়াইল
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম 
শামুক তুলে কেটে হাঁসমুরগিকে খাওয়ানোর জন্য তৈরি করছেন নারী। ছবি : সময়ের আলো
নড়াইলের বিলগুলোতে একসময় শামুকের প্রচুর উপস্থিতি ছিল। বর্ষা ও শীত মৌসুমে বিলের পানি, কাদা ও জলজ উদ্ভিদের আশপাশে অসংখ্য শামুক দেখা যেত। এগুলো মাছ, হাঁসসহ বিভিন্ন জলজ ও পরিযায়ী পাখির খাদ্যের প্রধান উৎস ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বিল ও জলাশয় থেকে নির্বিচারে শামুক সংগ্রহ করায় সেই চিত্র বদলে গেছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শামুক তুলে নেওয়ায় বিলগুলোতে শামুকের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।

শামুক কমে যাওয়ায় এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে পুরো জলজ পরিবেশে। কমছে পাখির খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং নষ্ট হচ্ছে বিলের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল। ফলে মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীর আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোর থেকেই নারী-পুরুষ ও শিশুরা দলবেঁধে বিলের অগভীর পানি ও কাদামাটি থেকে শামুক সংগ্রহ করছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সংগৃহীত শামুকের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে বিক্রি হলেও বড় একটি অংশ বাইরে চলে যায়। খোসা ও মাংসের ভালো চাহিদা থাকায় এর আহরণ দিন দিন বাড়ছে।

বসবাসকারী মিলন শেখ বলেন, বিল থেকে যারা শামুক কুড়াচ্ছে, ছোট শামুকও তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। প্রজননক্ষম হওয়ার আগেই ছোট শামুক তুলে নেওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে এর বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, শামুক জলজ পরিবেশে জৈব পদার্থের প্রক্রিয়াকরণ ও পুষ্টি উপাদানের পুনর্ব্যবচনে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে জলাশয় থেকে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ শামুক সরিয়ে ফেলায় খাদ্যশৃঙ্খলের অন্য স্তরগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


নড়াইলের বিভিন্ন বিল শীত মৌসুমে অতিথি পাখির অন্যতম প্রধান বিচরণক্ষেত্র হলেও খাদ্যসংকটের কারণে আগের তুলনায় পাখির সংখ্যা অনেক কমেছে। তাছাড়া, শামুক সংগ্রহের সময় বিলের তলদেশের কাদা ও পলি নাড়াচাড়া করায় পানির স্বচ্ছতা কমছে এবং জলজ উদ্ভিদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক স্থানে শামুকের খোসা ও মৃত বর্জ্য ফেলে রাখায় পানিতে দুর্গন্ধ সৃষ্টি ও গুণগত মানের অবনতি ঘটছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নড়াইলের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আরিফুর রহমান জানান, শামুক মাটির নিচে চলাফেরা করে মাটি আলগা করার মাধ্যমে বাতাস চলাচলের পথ তৈরি করে এবং বর্জ্য মাটির উর্বরাশক্তি বাড়ায়।

নড়াইল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, শামুক পানির ফিল্টার হিসেবে কাজ করে দূষিত পদার্থ পরিশোধিত করে মাছের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। তবে কিছু অসাধু মৎস্য চাষি নির্বিচারে শামুক নিধন করে মাছের (চিংড়ির) খাবার হিসেবে ব্যবহার করছে, যা প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য হুমকি। আমরা তাদের নিরুৎসাহিত ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছি।

দেশে সাড়ে চারশ প্রজাতির শামুক থাকলেও বিল অঞ্চলে ‘অ্যাপল শামুক’ বেশি পাওয়া যায় এবং এটি বাণিজ্যিক দিক থেকে মূল্যবান। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির শামুক সংরক্ষণের কথা থাকলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘অ্যাপল শামুক’-এর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট উল্লেখ না থাকায় এর অতিরিক্ত আহরণ নিয়ন্ত্রণে আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

দেশীয় প্রজাতির মাছ এবং শামুক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কয়েকটি জেলায় পাইলটিং আকারে শামুক প্রদর্শনী খামার স্থাপন করা হলেও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে শামুকের কাঙ্ক্ষিত প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকৃতি থেকে শামুক সংগ্রহের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   নড়াইল  বিল  শামুক নিধন  অতিথি পাখি  হুমকি  জলজ জীববৈচিত্র্য  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: