পেঁয়াজের বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। রাজশাহীর বাগমারার বিখ্যাত পেঁয়াজের হাট তাহেরপুর, হামিরকুৎসা, হাটগাঙ্গোপাড়া ও শিকদারিসহ ছোট ছোট হাটগুলোতে পেঁয়াজের দর পড়ে গেছে আশঙ্কাজনকহারে। এর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ পেঁয়াজের হাট তাহেরপুরে গত সপ্তাহে মুড়ি পেঁয়াজের দাম কমে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করেছে কৃষক।
কয়দিন আগেও ৩৫০-৪০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হলেও এখন দরপতনের শঙ্কায় কৃষকরা চোখে সর্ষেফুল দেখছেন। অন্যদিকে মুড়ি পেঁয়াজের পাশাপাশি তাহেরপুরী জাতের পেঁয়াজ বাজারে উঠতে শুরু করেছে, যা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার হামিরকুৎসা হাটে দেখা যায়, ১৬০ থেকে ২০০ টাকা মণ দরে পেঁয়াজ বিক্রি করছে কৃষক। কৃষকের উৎপাদন খরচের তুলনায় এই দর একেবারেই অস্বাভাবিক ও কৃষকদের জন্য চরম ক্ষতির কারণ।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, পেঁয়াজ কিছুটা পচনশীল পণ্য। ভরা মৌসুমে সহজলভ্য হওয়ায় মোকামে আমদানি বাড়ে। এতে পেঁয়াজের দাম পড়ে যায়। চাষিরা উৎপাদনসহ আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে বাধ্য হয়ে জমি থেকে তুলেই পেঁয়াজ বিক্রি করতে হাটে তোলে। এই সুযোগটা কাজে লাগায় ফড়িয়া, দালাল ও মজুদদাররা। কম দামে চাষির কাছ থেকে কিনে পেঁয়াজ গুদামে রাখে। সরবরাহ কমে গেলে বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তারা মুনাফা করেন।
পেঁয়াজের অস্বাভাবিক দরপতনের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আফিয়া আকতার বলেন, আমিও শুনেছি পেঁয়াজের দাম অনেক কমে গেছে। রাজশাহী থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেঁয়াজ, আলু, মাছসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বিপুল পরিমাণে চালান হয়ে থাকে। বর্তমানে জ্বালানির কিছুটা সমস্যা থাকায় কৃষিপণ্য চালান ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিপণ্য চালানে নিয়োজিত পরিবহন যাতে জ্বালানি পায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কৃষকদের প্রশ্ন, দাম বাড়লেই ভোক্তা অধিকার, টিভি চ্যানেল আর গণমাধ্যমের তৎপরতা চোখে পড়ে, কিন্তু দাম পড়ে গেলে কৃষকের জন্য কেউ কথা বলে না কেন? কৃষিবিদ রোকনুজ্জামানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি শুধু একটি কৃষিপণ্যের দরপতন নয়, এটি ধারাবাহিকভাবে চলে আসা কৃষকের প্রতি অবহেলা। সঠিক সময়ে বাজার তদারকি, সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করলে কৃষকরা কৃষিকাজ ছেড়ে শ্রমিক হয়ে যাবেন- এমন আশঙ্কা রয়েছে। এতে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে পুরো কৃষি খাতে।
তিনি আরও বলেন, যে দেশে মোট জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশ কৃষক, সে দেশে কৃষকের জন্য কতটুকু বরাদ্দ, তাদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়াসহ কোনো কিছুতেই রাষ্ট্রীয়ভাবে আলাদা কোনো সুবিধা নেই বললেই চলে। এ জন্যই যারা ধনী তারা আরও ধনী হচ্ছে আর কৃষকের ঋণের বোঝা বাড়ছে। নতুন সরকারের কাছে কৃষকদের প্রত্যাশা হচ্ছেÑ এ কৃষিপণ্যের ন্যায্যদাম নিশ্চিত করবেন। এ জন্য পেঁয়াজের বাজারে ধস নামার কারণ তদন্ত করে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। এটি না হলে আগামী দিনে এর মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে মুড়িকাটা বা আগাম জাতের পেঁয়াজের আবাদ হয় ৮ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে। এ মৌসুমে রাজশাহীতে পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৪ লাখ ৩২ হাজার ৩০০ টন। অন্যদিকে মুড়িকাটা পেঁয়াজ ফলনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ টন। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় চলতি মৌসুমে রাজশাহীর সর্বত্রই তাহেরপুরী ও নাসিক এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজের ভালো ফলন হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তারা আরও জানান, বর্তমানে মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠানো চলছে পুরোদমে। শিগগির মুড়িকাটা পেঁয়াজ উত্তোলন শেষ হবে। এরপরই উঠতে শুরু করবে ছাঁচি বা দেশি জাতের পেঁয়াজ। জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে রাজশাহীর তাহেরপুর, আলোকনগর, হাটগাঙ্গোপাড়া, দামনাশ, দুর্গাপুরের আলীপুর, পুঠিয়ার ঝলমলিয়া, মোহনপুরের কেশরহাট, পবার খড়খড়ি ও নওহাটাসহ বিভিন্ন মোকামে অস্বাভাবিক কম দরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। দাম না পাওয়ায় চাষিরা হাটের ফাঁকা মাঠে পেঁয়াজ রেখে চলে যাচ্ছেন। কারণ পেঁয়াজ কেনার ক্রেতা পাচ্ছেন না।
কৃষক সেকেন্দার আলী বলেন, রোজার মধ্যে দর পতনের জন্য পেঁয়াজ রেখে দিয়েছিলাম। এখন এমন দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হবে ভাবতেই পারিনি। মাঠ থেকে পেঁয়াজ নিয়ে এসে লোকসানের বোঝা কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে সবার। বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি সব মিলিয়ে যে খরচ, সে হিসাবের ধারে-কাছেও নেই বর্তমান বাজারদর। বাধ্য হয়ে আমার মতো অনেক কৃষক কষ্ট পেলেও কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন বাধ্য হয়ে। কারণ নতুন পেঁয়াজ আমদানি বৃদ্ধি পেলে এটা বিক্রি করা আরও মুশকিল হয়ে যাবে।
কৃষক মোস্তফা কামাল মিঠু ৮ মণ পেঁয়াজ বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন ভোর ৫টায়। অবশেষে সকাল ১০টায় তিনি ১৬০ টাকা মণ দরে পেঁয়াজ বিক্রি করেন।
তিনি বলেন, সরকার চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ায়, কিন্তু কৃষকের জন্য কী করে? এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে একটি তরমুজও কেনারও সামর্থ্য থাকে না কৃষকের। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকদের পথে বসতে হবে। শুধু তিনি নন, পাশে থাকা সব কৃষকই একই ক্ষোভে ফুঁসছেন।
সময়ের আলো/কেএইচও