ইরানের হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাসের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে প্রবেশ করায় এই সংকট আরও গভীর হয়েছে।
বুধবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে আরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ হামলা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলে তেলের দাম আবারও বেড়ে যায়।
ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বৃহস্পতিবার বেড়ে দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ১০৬.১৬ ডলার, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। এর আগে চলতি সপ্তাহে দাম ১১৬ ডলার ছাড়িয়েছিল।
এদিকে, বিশ্বের অনেক দেশ অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে তাদের ‘কৌশলগত তেল মজুত’ ব্যবহার শুরু করেছে। তবে ইরানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও চীন এই সংকট থেকে অনেকটাই নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছে।
চীন কি পুরোপুরি সংকটমুক্ত?
চীন পুরোপুরি সংকটমুক্ত নয়। চীনের মোট আমদানিকৃত তেলের অর্ধেকেরও বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে ইরান থেকে। কেপলার থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের রপ্তানিকৃত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছিল চীন। প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করেছে দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। তবে চীন যেন আগে থেকেই এই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২১ সালে এক তেলক্ষেত্র পরিদর্শনের সময় বলেছিলেন, দেশটি তার জ্বালানি নিরাপত্তা নিজের হাতেই নেবে।
এই লক্ষ্যেই চীন “টি পট রিফাইনারি” নামে পরিচিত ছোট স্বাধীন তেল শোধনাগারগুলো ব্যবহার করছে। এসব রিফাইনারি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে সস্তা তেল কিনে মজুত করে এবং ইরান, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলা থেকে আমদানি বাড়ায়।
তেল আমদানির বর্তমান অবস্থা
কেপলারের অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক মুয়ু শুয়ের মতে, চীন পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
তিনি জানান, মার্চ মাসে চীনের সমুদ্রপথে অপরিশোধিত তেল আমদানি দৈনিক ১০.১৯ মিলিয়ন ব্যারেল ছিল, যা ফেব্রুয়ারিতে ১১.৫১ মিলিয়ন ব্যারেল ছিল। তবে ২০২৫ সালের গড় ১০.৪১ মিলিয়ন ব্যারেলের সঙ্গে এখনও মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, মার্চ মাসে আমদানিকৃত তেলের একটি বড় অংশই যুদ্ধের আগেই পাঠানো হয়েছিল। ফলে এপ্রিল মাসে আমদানিতে বড় ধরনের পতন দেখা যেতে পারে।
তার মতে, রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল আমদানি কিছুটা সহায়ক হলেও, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য উৎস থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হবে না।
তিনি জানান, পারস্য উপসাগরের বাইরে ইরানি তেলের মজুদ প্রায় ১৬৫ মিলিয়ন ব্যারেল, যা চীনের প্রায় চার মাসের আমদানির সমান। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
‘টি পট’ রিফাইনারি কী?
“টি পট রিফাইনারি” হলো চীনের শানডং প্রদেশভিত্তিক ছোট, বেসরকারি তেল শোধনাগার।
এগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরান ও রাশিয়া থেকে কম দামে তেল আমদানি করে। বড় রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো ঝুঁকি এড়াতে সরাসরি এসব তেল কেনে না; বরং এই ছোট রিফাইনারিগুলো সেই কাজটি করে।
ইরানি তেলের মূল্য পরিশোধ করা হয় চীনের মুদ্রা রেনমিনবিতে, ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (CIPS)-এর মাধ্যমে।
এগুলোকে “টি পট” বলা হয় কারণ আকারে ছোট এবং দেখতে চায়ের কেতলির মতো। চীনের মোট তেল শোধন ক্ষমতার প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে এসব রিফাইনারি থেকে।
তবে তেলের দাম বাড়লে তাদের লাভের মার্জিন কমে যায় এবং উৎপাদনে চাপ পড়ে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ‘টি পট’ শোধনাগারের ভূমিকা
এই রিফাইনারিগুলো আগেই সস্তা দামে তেল কিনে মজুত করায় স্বল্পমেয়াদে চাপ কম রয়েছে।
একজন কর্মকর্তা জানান, আগে মজুত থাকায় এখন তেমন চাপ নেই। তবে নতুন করে সস্তা তেল পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে উৎপাদন কমানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
চীনের বড় কোম্পানিগুলো কৌশলগত মজুত ব্যবহারের অনুমতি চাইছে, ফলে দীর্ঘমেয়াদে ‘টি পট’ রিফাইনারিগুলো ঘাটতি পূরণে সমস্যায় পড়তে পারে।
চীন কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে
১. বিশাল তেল মজুত গড়ে তোলা
চীন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলো থেকে কম দামে তেল কিনে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ব্যারেলের কৌশলগত মজুত তৈরি করেছে, যা প্রায় ১০৯ দিনের চাহিদা পূরণ করতে পারে।
২. ‘শ্যাডো ফ্লিট’ ব্যবহার
পুরনো ও ভিন্ন পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজের নেটওয়ার্ক—‘শ্যাডো ফ্লিট’—ব্যবহার করে চীন রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল আমদানি করছে।
৩. আমদানির উৎস বৈচিত্র্য করা
চীন রাশিয়া থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আমদানি বাড়িয়েছে এবং বিকল্প উৎস খুঁজছে।
হরমুজ অবরোধ ও বৈশ্বিক প্রভাব
ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন বন্ধ করে দেওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।
অনেক দেশ জ্বালানি রেশনিং শুরু করেছে এবং শিল্প উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
এশিয়ার দেশগুলো নিরাপদ জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে কিছু দেশ সীমিতভাবে প্রণালী ব্যবহার করার অনুমতি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের আগ্রাসী মজুত নীতি, ‘টি পট’ রিফাইনারি এবং ‘শ্যাডো ফ্লিট’ কৌশল দেশটিকে বর্তমান সংকটে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে।
তবে এসব ব্যবস্থা চীনকে পুরোপুরি নিরাপদ করতে পারবে না। তবুও অন্যান্য দেশের তুলনায় সংকট মোকাবিলায় চীন বেশি সক্ষমতা ও নমনীয়তা দেখাচ্ছে।
/ইউএমএইচ