গুমের শিকার বিএনপিই চায় না গুম অধ্যাদেশ

এম মামুন হোসেন ও সাব্বির আহমেদ

রাজনীতি

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার বনানী এলাকা থেকে সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হন। তার

2026-04-04T00:36:17+00:00
2026-04-04T00:36:31+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
রাজনীতি
গুমের শিকার বিএনপিই চায় না গুম অধ্যাদেশ
এম মামুন হোসেন ও সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৩৬ এএম  আপডেট: ০৪.০৪.২০২৬ ১২:৩৬ এএম  (ভিজিট : ১০৮)
প্রতীকী ছবি
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার বনানী এলাকা থেকে সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হন। তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক আনসার আলীকেও সেই সময় খুঁজে পাওয়া যায়নি। একইভাবে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীর বাসা থেকে নিখোঁজ হন সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ আরও কয়েকজন বিএনপিকর্মী। এসব ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তোলে। পরিবার, দলীয় নেতাকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার অভিযোগ করেছে- এগুলো পরিকল্পিত গুম। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এই ঘটনার কোনো সুস্পষ্ট তদন্ত ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি। ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালে এই ঘটনাগুলোর মতো গুমের তালিকা আরও দীর্ঘ হয়েছে।

গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী ‘গুমের’ পর ফিরে না আসা রাজনৈতিক দলসংশ্লিষ্টদের ৬৮ শতাংশই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের। অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করে জানিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ সারা দেশে বিএনপির ২ হাজার ২৭৬ জনকে ক্রসফায়ারে হত্যা এবং ১৫৩ জনকে গুম করে।

এর ফলে বিগত বছরগুলোতে গুম-খুনের শিকার হিসেবে বিএনপির নেতাকর্মীদের নামই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে কিন্তু সেই দলই এখন গুম প্রতিরোধে জারি করা অধ্যাদেশ নিয়ে স্পষ্ট সমর্থন না দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে তাদের অবস্থান নিয়ে। এ নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে সমালোচনা বাড়ছে আর সংসদে আলোচনার আগেই বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে।

একজন মানবাধিকারকর্মী তার ফেসবুকে লিখেছেন, যারা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদেরই যদি সত্য উদঘাটনের উদ্যোগে অনীহা থাকে, তা হলে সাধারণ মানুষ কার কাছে আশ্রয় নেবে?
আরও পড়ুন

গুম প্রতিরোধে করা অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করার সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলোর ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। এটি হলে এ অধ্যাদেশগুলো বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। ১০ এপ্রিলের পর এগুলো কার্যকারিতা হারাবে। সব মিলিয়ে মোট ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

বহুল আলোচিত গুম প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। গুম থেকে সব ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বিধানাবলি বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এ অধ্যাদেশ করা হয়। এতে গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এর সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। পরে সংশোধনী এনে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি অন্তত পাঁচ বছর ধরে গুম থাকলে ট্রাইব্যুনাল তার সম্পত্তি বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনযোগ্য ঘোষণা করতে পারবে।

বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, এই অধ্যাদেশ চলতি অধিবেশনে পাসের জন্য তোলা না হলে তা কার্যকারিতা হারাবে। এ সিদ্ধান্তে জামায়াতের সদস্যদের ভিন্নমত আছে। তাতে বলা হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে এই অধ্যাদেশ ল্যাপস (বাদ দেওয়া) করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারে যুক্তি হচ্ছে, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতি লাগবে। জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আটক গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দিতে হবে। তবে বিরোধী দলের যুক্তি হচ্ছে, গত ১৫ বছরে গুমের শিকার পরিবারগুলো সরকারের কাছে ন্যায়বিচার পায়নি। সরকারের কাছে অনুমতি চাইলে অনুমতি কখনো মেলে না। অনুমতির চাওয়া দায়মুক্তি।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে বৃহস্পতিবার এসব সুপারিশসহ সংসদে প্রতিবেদন দেয় জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। সন্ধ্যায় কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টির বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) দিয়েছেন বিশেষ কমিটিতে থাকা জামায়াতে ইসলামীর তিন সংসদ সদস্য। প্রতিবেদনে তাদের ভিন্নমতের উল্লেখ করা হয়েছে।

যাচাই-বাছাইয়ে ১৩ সদস্যের এই কমিটির প্রধান বরিশাল-৩ আসনের এমপি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন সময়ের আলোকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাড়াহুড়ো করে বেশ কিছু অধ্যাদেশ জারি করেছে। এগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। বিল আকারে পাঠানোর পর এ নিয়ে ৯ এপ্রিল থেকে সংসদে আলোচনা হবে। গুম কমিশন একেবারে বাতিল হচ্ছে তা কিন্তু নয়। তিনি জানান, অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই কমিটিতে আছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলামসহ কয়েকজন মন্ত্রী। এ ছাড়া বিরোধী দলের তিনজন এমপি এই কমিটিতে আছেন। পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামী এই কমিটিতে পরামর্শক হিসেবে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, গুম কমিশন একেবারে বাতিল হচ্ছে, ব্যাপারটা এরকম নয়। অধ্যাদেশের মধ্যে মানবাধিকার কমিশন ও আইসিটি অ্যাক্টের মধ্যে কিছু সাংঘর্ষিক বিষয় রয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অধ্যাদেশে গুম কমিশন যুক্ত হওয়ার ফলে কমিশনের মূল কাজ ব্যাহত হতে পারে। তাই এ আইনটি নিয়ে সরকারকে ভাবতে হচ্ছে। আমরা এগুলো যাচাই-বাছাই করব। বিল আকারে সংসদে উত্থাপন হবে। এরপর সংসদে এ নিয়ে আলোচনা হবে।

গুমের শিকার বিএনপির সাবেক এমপি এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এমপি তাহসিনা রুশদীর লুনা সময়ের আলোকে বলেন, আমি ঠিক এ বিষয়ে বলতে পারব না। শুনেছি এ নিয়ে একটি যাছাই-বাছাই কমিটি হয়েছে, আমি সেখানে নেই। তারা কাজ করছেন। কিছু নোট অব ডিসেন্টও (ভিন্নমত) আছে। সংসদে এ প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েই সিদ্ধান্ত হবে বলে বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে দলীয়ভাবে বিএনপির কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব যায়নি। দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে বারবার ফোন ও মেসেজ দিয়েও বক্তব্য পাওয়া যায় না। কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সময়ের আলোকে বলেন, আমি এ বিষয়ে বলার কেউ নই। আমার কাছে এসব জিগ্যেস করে লাভ হবে না।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিগত স্বৈরাচার সরকারের সময় গুম খুনের শিকার হওয়া একটি দলের সরকার কীভাবে গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশকেও কোন যৌক্তিকতায় এবং কাদের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের ফাঁদে ফেলে দিল? তিনি বলেন, আইনে কোনো অন্তর্নিহিত দুর্বলতা থাকলে সেটি অবশ্যই দূর করা যেতে পারে কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ের নামে গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলোকে সুবিধা বা দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা বা বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের অনুমতির নামে কিংবা ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ অজুহাত তুলে এটিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দুর্বল করা হয়, তা শুধু আত্মঘাতীই হবে না বরং দেশে কার্যকর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে পেছনে হাঁটার শামিল।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের অংশ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এই দুটিসহ চারটি অধ্যাদেশ বাতিল করতে (রহিত) সংসদে বিল আনার সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। এ ছাড়া গণভোট অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ক্ষমতা বাড়িয়ে করা অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধে করা অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করার সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলোর ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। এটি হলে এ অধ্যাদেশগুলো বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। ১০ এপ্রিলের পর এগুলো কার্যকারিতা হারাবে। সব মিলিয়ে মোট ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে। বাকি ১১৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে করা জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশসহ ৯৮টি অনুমোদনের জন্য হুবহু বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। আর সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশসহ ১৫টি সংশোধিত আকারে বিল উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি।

নিয়ম অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠক ১২ মার্চে অধ্যাদেশগুলো উপস্থাপন করা হয়। পরে এগুলো যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করে সংসদ। আগামী সোমবার অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে উপস্থাপনের কার্যক্রম শুরু হবে।

এএডি/


Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: