জামালপুরের বকশীগঞ্জে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ছেড়ে যাচ্ছেন বাসিন্দারা। নিরাপত্তার অভাব, কর্মসংস্থান না থাকায় ঘরে তালা মেরে একে একে ঘর ছাড়ছেন লাউচাপড়া ডুমুরতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার আশায় ডুমুরতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস শুরু করলেও সেই আশা অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল হাই বলেন, প্রকল্পগুলোর বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসরত কোনো পরিবার যদি সরকারি কোনো সহায়তা না পেয়ে থাকে তাদের দ্রুত সহায়তা করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেন বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাপ জামাল বলেন, ডুমুরতলা আশ্রয়ণ কেন্দ্রে বর্তমানে কতটি পরিবার আছে বা চলে গেছে তা খোঁজ নেব। প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়ারও আশ্বাস দেন ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাপ জামাল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় বকশীগঞ্জ উপজেলায় ২১২টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ১৪২টি, দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫০টি এবং তৃতীয় পর্যায়ে ২০টি ঘর অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রথমে সব ঘর অসহায় গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলেও ঘর নির্মাণে বসবাসের অনুপযোগী জায়গা নির্ধারণ, অনিয়ম ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেশিরভাগ ঘরে এখন পর্যন্ত মানুষের বসতি গড়ে ওঠেনি, বরং ঘরগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
আরও পড়ুন
উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের ডুমুরতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ২৮টি ঘরের মধ্যে ১৮টি ঘরেই দরজা-জানালা বন্ধ ও তালাবদ্ধ। অনেক ঘরে ফাটল ধরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব ঘরে নেই কোনো বাসিন্দা, নেই জীবনের চিহ্ন। ঘরগুলোর চারপাশে আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ভরে গেছে। রাতে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে অন্ধকার ও নির্জন। শুরুতে ২৮টি পরিবার এখানে বসবাস শুরু করেছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তার অভাবে একে একে অনেকেই প্রকল্পের ঘর ছেড়ে চলে গেছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাত হলেই ভয় ও আতঙ্ক শুরু হয় এখানে। প্রকল্পের চারপাশে বিস্তীর্ণ পাহাড় ও ঘন জঙ্গল থাকায় বনবিড়াল ও শেয়ালের উপদ্রব দেখা যায়। রাস্তায় ও বাইরে নেই কোনো লাইটের ব্যবস্থা। ঘুটঘুটে অন্ধকারে শিশু ও নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকে পরিবারগুলো। অথচ আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল অসহায় মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রয়োজনীয় তদারকি ও সহায়তার অভাবে প্রকল্পটি এখন অনেকটাই প্রাণহীন। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অবশিষ্ট পরিবারগুলোর পক্ষেও সেখানে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। সরকারি সংশ্লিষ্ট দফতরের জরুরি নজরদারি ও কার্যকর উদ্যোগই পারে কামালপুর ডুমুরতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পকে আবার প্রাণবন্ত করে তুলতে।
বর্তমানে বসবাসরত ১০টি পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর পাওয়ার পর আর কোনো সরকারি সহায়তা বা পুনর্বাসন সুবিধা তারা পাননি।
প্রকল্পে বসবাসরত বাসিন্দা নুর হোসেন ও কাপাসি বেগম বলেন, আমরা ঘর পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু কাজের ব্যবস্থা নেই, নিরাপত্তা নেই। কোনো ভাতা বা সহযোগিতাও পাচ্ছি না। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি। তারা আরও বলেন, আমাদের নিয়মিত খাদ্য সহায়তা নেই, বিদ্যুতের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, চিকিৎসা ও শিক্ষা সুবিধা এখান থেকে অনেক দূরে।
রাত হলে চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। শেয়ালের ডাক শোনা যায়। বাচ্চারা ভয় পায়, আমরাও আতঙ্কে থাকি।
এলাকাবাসীর দাবি, পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই ফাঁকা ঘরগুলোতে দ্রুত নতুন পরিবার পুনর্বাসন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা, সোলার লাইট স্থাপনসহ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার পাশাপাশি নিয়মিত সরকারি তদারকি, সহায়তা প্রদান, আশপাশ পরিষ্কার ও ঝোঁপঝাড় অপসারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এএডি/