ঝপাৎ করে পানিতে পা দিতেই চারদিকে ছিটকে উঠল ছোট ছোট পানির ফোঁটা। ‘খুকু! দেখ দেখ, আমি নদী বানিয়ে ফেলেছি!’ খোকা আনন্দে চিৎকার করে উঠল। খুকু দৌড়ে এসে তার পাশে বসে পড়ল। পায়ের নিচে নরম কাদামাটি, সামনে ছোট্ট পানির স্রোত। সে হাত ডুবিয়ে একটু ছুঁয়ে বলল, ‘এটা নদী না, এটা আমাদের রাজ্যের সোনার খাল!’ দুজনের চোখে তখন এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাস। খালটার দুই ধারে তারা কাদা দিয়ে ছোট ছোট বাঁধ বানাতে লাগল, যেন সত্যিই কোনো রাজ্যের সীমানা গড়ে তুলছে। খোকা বলল, ‘এখানে একটা সেতু বানাতে হবে!’ খুকু তাড়াতাড়ি কয়েকটা কাঠি এনে বসিয়ে দিল- মুহূর্তেই তৈরি হয়ে গেল তাদের কল্পনার সেতু।
হঠাৎ খোকার মাথায় বুদ্ধি এলো। সে দৌড়ে ঘরের ভেতর গিয়ে একটা পুরোনো খাতা ছিঁড়ে নিয়ে ফিরে এলো। খুকু অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘এটা দিয়ে কী করবি?’ খোকা মুচকি হেসে বলল, ‘দেখ, আজ আমরা শুধু খাল বানাব না, নৌকাও চালাব!’ সে কাগজ ভাঁজ করতে লাগল- একবার, দুবার, তিনবার... একটু পরেই তৈরি হলো ছোট্ট একটি নৌকা। খুকুর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ‘ওহ! এটা তো একদম আসল নৌকার মতো!’ খুকুও আর দেরি করল না। সেও নিজের মতো করে আরেকটা নৌকা বানিয়ে ফেলল। তারপর দুজনেই তাদের নৌকা নামিয়ে দিল সেই বৃষ্টির খালে। নৌকাগুলো ধীরে ধীরে ভেসে যেতে লাগল। খুকু হাততালি দিয়ে বলল, ‘দেখো! আমার নৌকাটা এগিয়ে যাচ্ছে!’ খোকা বলল, ‘ওটা তো রাজকুমারীর জাহাজ, আর আমারটা সৈন্যদের!
ঠিক তখনই কয়েকটা হাঁস এসে খালে নেমে পড়ল। তারা পানিতে ভেসে বেড়াতে লাগল, মাঝে মাঝে ঠোঁট দিয়ে নৌকাগুলোকে আলতো করে ঠেলা দিচ্ছে। খোকা হেসে বলল, ‘হাঁসগুলো আমাদের নৌকার মাঝি হয়ে গেছে!’ পাশে দাঁড়িয়ে মুরগির দল কৌতূহল নিয়ে সব দেখছে। একটা মুরগি এগিয়ে এসে নৌকার দিকে তাকিয়ে কুটকুট করতে লাগল। খুকু বলল, ‘এই! সাবধানে!
এটা কিন্তু আমাদের রাজ্যের জাহাজ!’ হঠাৎ ‘ভোলু’ কুকুরটা দৌড়ে এসে খালে ঝাঁপ দিল- ছপাৎ! পানি ছিটকে গিয়ে এক নৌকা কাত হয়ে গেল। খুকু চিৎকার করে উঠল, ‘ওরে! আমার নৌকা ডুবে যাবে!’ খোকা দ্রুত হাত বাড়িয়ে নৌকাটা ঠিক করে দিল। ‘চিন্তা করিস না, আমি আছি!’ দূরে বসে থাকা বিড়াল ‘মিনি’ ধীরে ধীরে এসে খালের পাশে বসে সব দেখছিল। তার চোখে যেন বিস্ময়- এত ছোট জিনিস কীভাবে পানিতে ভাসে! খুকু ফিসফিস করে বলল, ‘মিনি ভাবছে, ওর জন্যও একটা নৌকা বানাব কি না!’
আরও পড়ুন
বৃষ্টির ফোঁটা গাছের পাতায় টুপটাপ শব্দ তুলছে। আমগাছ, কলাগাছ দুলছে হাওয়ায়, যেন তারাও খেলায় মেতে উঠেছে। খুকু দুই হাত তুলে বলল, ‘গাছেরা! তোমরাও কি আমাদের নৌকা দেখছো?’ হাওয়ার ঝাপটায় পাতাগুলো নড়ে উঠল। খোকা বলল, ‘তারা বলছে- আরও নৌকা বানাও!’ শুরু হলো নতুন খেলা। খোকা-খুকু আরও কাগজ এনে একের পর এক নৌকা বানাতে লাগল- ছোট, বড়, লম্বা, গোল- নানারকম নৌকা ভাসতে লাগল সেই খালে। খুকু আনন্দে বলল, ‘এইটা আমাদের বৃষ্টির বন্দর!’ খোকা বলল, ‘আর এসব নৌকা আমাদের স্বপ্নের জাহাজ!’ হঠাৎ আকাশে মৃদু গর্জন শোনা গেল। খুকু একটু চুপ হয়ে গেল। খোকা মুচকি হেসে বলল, ‘ভয় পাস না, আকাশের ঢোল বাজছে!’ ধীরে ধীরে বৃষ্টি কমে এলো। নৌকাগুলো এখনও পানিতে ভাসছে, তবে ধীরগতিতে। গাছের পাতায় জমে থাকা ফোঁটাগুলো রোদে চিকচিক করছে। হাঁসগুলো পুকুরে ফিরে গেল, মুরগিগুলো ঘরে ঢুকল, ভোলু বারান্দায় শুয়ে পড়ল, আর মিনি রোদে গা এলিয়ে দিল। খুকু একটি ভেজা নৌকা হাতে নিয়ে বলল, ‘খোকা, আমাদের নৌকাগুলো আবার ভাসবে তো?’ খোকা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যখনই বৃষ্টি আসবে, তখনই আমাদের নৌকাগুলো আবার যাত্রা শুরু করবে!’ আর সেই ছোট্ট খাল, কাগজের নৌকা আর বৃষ্টির ফোঁটা যেন একসঙ্গে বলে উঠল- আমরা আবার ফিরব, তোমাদের সঙ্গে খেলতে।
এএডি/