সমতলের সবুজ সোনা পঞ্চগড়ের চা

এসকে দোয়েল, পঞ্চগড়

সারাদেশ

একসময়ের অনাবাদি গো-চারণ ভূমি এখন সমতলের সবুজ গালিচা। যে জনপদে একসময় ছিল চরম দারিদ্র্যের কষাঘাত, আড়াই দশকের ব্যবধানে সেখানে বইছে

2026-04-05T04:13:48+00:00
2026-04-05T04:13:48+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
সমতলের সবুজ সোনা পঞ্চগড়ের চা
এসকে দোয়েল, পঞ্চগড়
প্রকাশ: রোববার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:১৩ এএম 
সংগৃহীত ছবি
একসময়ের অনাবাদি গো-চারণ ভূমি এখন সমতলের সবুজ গালিচা। যে জনপদে একসময় ছিল চরম দারিদ্র্যের কষাঘাত, আড়াই দশকের ব্যবধানে সেখানে বইছে সমৃদ্ধির হাওয়া। হিমালয়কন্যা পঞ্চগড়ে চায়ের এই নীরব বিপ্লব কেবল 
ভূ-প্রকৃতি নয়, বদলে দিয়েছে এ অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক ভাগ্য। সিলেট ও চট্টগ্রামের পর এখন দেশের তৃতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছে উত্তরের এই জেলা।

যেভাবে শুরু এই যাত্রা : তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, পঞ্চগড়ে চা চাষের স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছিল নব্বই দশকের শেষভাগে। তৎকালীন জেলা প্রশাসক রবিউল ইসলামের ব্যক্তিগত আগ্রহে পরীক্ষামূলকভাবে টবে চা গাছ লাগানো হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতের দার্জিলিংয়ের আবহাওয়া ও মাটির সঙ্গে পঞ্চগড়ের মাটির মিল থাকায় চা আবাদের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। 

১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ চা বোর্ড ও চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের জরিপে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে প্রায় ৪০ হাজার একর জমি চা চাষের উপযোগী বলে শনাক্ত করা হয়। ২০০০ সালে তেঁতুলিয়া টি কোম্পানি ও কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট বাণিজ্যিকভাবে এই অঞ্চলে চায়ের চাষ শুরু করে। এক বছর পর ২০০১ সালে চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুদ্র চাষিদের মধ্যে ধীরে ধীরে উৎসাহ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মতিয়ার রহমান, সিরাজুল ইসলামদের মতো হাতেগোনা কয়েকজনকে নিয়ে শুরু হওয়া সেই পদযাত্রা আজ হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন।

পরিসংখ্যানে বিস্ময়কর উত্থান : চা বোর্ডের তথ্যমতে, ২০০৬ সালে পঞ্চগড়ে চায়ের আবাদি জমির পরিমাণ ছিল মাত্র ৯২৫ একর। বর্তমানে তা ১৩ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৭৯ একরে। জেলায় বর্তমানে ৯টি বড় বাগান থাকলেও ক্ষুদ্রায়তন বাগানের সংখ্যা ৮ হাজার ৩৫৫টি। ২০২৩-২৪ অর্থবছর নাগাদ এ অঞ্চলে বার্ষিক চা উৎপাদন ২ কোটি কেজি ছাড়িয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় চা উৎপাদন আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে সাড়ে ৫৮ লাখ কেজি। ২০২৫ সালে উত্তরের পাঁচটি জেলার সমতল ভূমিতে চা উৎপাদিত হয়েছে ২ কোটি ২ লাখ ৪২ হাজার ৫২ কেজি যা আগের বছরের তুলনায় ৫৮ লাখ ৫১ হাজার ৯০১ কেজি বেশি। 

সিলেট ও চট্টগ্রামের পর উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী এবং লালমনিরহাট- এই পাঁচ জেলা বর্তমানে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম চা অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে এই অঞ্চলে ২৩টি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা চালু রয়েছে। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি কারখানা চালুর অপেক্ষায় আছে। চা উৎপাদনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে টানা পাঁচবার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড ধরে রেখেছে উত্তরাঞ্চল। এদিকে চট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গলের পর দেশের তৃতীয় চা নিলাম কেন্দ্র পঞ্চগড়ে স্থাপন করা হয়েছে যা উত্তরের চা শিল্পের জন্য এক মাইলফলক।

বদলে যাওয়া জীবনমান ও কর্মসংস্থান : চায়ের ছোঁয়ায় পঞ্চগড়ে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল কর্মযজ্ঞ ও কর্মস্থানের সুযোগ। ২০০৬ সালে এই শিল্পে যেখানে মাত্র দেড় হাজার শ্রমিক কাজ করতেন এখন সেখানে কাজ করছেন অন্তত ১৫ হাজার মানুষ। পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে এই খাতের সঙ্গে।

সরেজমিন আলাপকালে স্থানীয় চা চাষিরা জানান, একর প্রতি বছরে ২-৩ লাখ টাকা আয় হচ্ছে। শ্রমিকরা প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। একসময়ের দিনমজুর আজ বাগানের মালিক হয়ে উঠেছেন। ছনের ঘরের বদলে গড়ে উঠেছে ইটের পাকা দালান। আধুনিক শহরের সব সুবিধা এখন পৌঁছে গেছে চায়ের গ্রামে।

আন্তর্জাতিক বাজারে পঞ্চগড়ের অর্গানিক চা : পঞ্চগড়ের চা কেবল পরিমাণ নয়, মানেও বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট এখানে শতভাগ অর্গানিক বা জৈব চা উৎপাদন করছে। এই চা এখন লন্ডনের হ্যারোডস অকশন মার্কেটসহ দুবাই, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সমাদৃত।

পর্যটনে নতুন দিগন্ত টি-ট্যুরিজম : সবুজ চায়ের বাগান ঘিরে পঞ্চগড়ে বিকশিত হচ্ছে ইকো ট্যুরিজম। প্রতি বছর কয়েক লাখ পর্যটক সমতলের এই চা বাগান দেখতে ভিড় করছেন। তেঁতুলিয়ায় মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা গ্রিন টি ভ্যালি রিসোর্টসহ ছোট ছোট পর্যটন কেন্দ্রগুলো চা পর্যটন বা টি-ট্যুরিজমের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। 
কৃষি পর্যটনের এই ধারা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে।

এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ চা বোর্ডের উন্নয়ন কর্মকর্তা আমির হোসেন বলেন, স্থানীয় চা চাষিদের দক্ষ করার উদ্দেশ্যে ক্যামেলিয়া খোলা আকাশ স্কুলের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। পোকা দমন এবং বৈজ্ঞানিক সহায়তার জন্য দুটি পাতা একটি কুঁড়ি মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে চা চাষিদের। এ ছাড়া আধুনিক পেস্ট ম্যানেজমেন্ট ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান বাংলাদেশ চা বোর্ডের উন্নয়ন কর্মকর্তা আমির হোসেন।

স্থানীয়রা বলছেন, পঞ্চগড়ের সমতল ভূমিতে চায়ের এই বিপ্লব কেবল একটি কৃষি সাফল্য নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক মুক্তির মহাকাব্য। আখের বদলে চায়ের এই বিস্তৃতি আগামী কয়েক বছরে পঞ্চগড়কে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে- এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় লোকজন এবং চা শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষদের।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   সমতল  সবুজ  সোনা  পঞ্চগড়  চা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: