যুদ্ধ শুরুর সময় প্রতিশ্রুতি ছিল স্পষ্ট-দ্রুত, নির্ভুল আঘাত, সীমিত সময় এবং নিশ্চিত ফল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে এমনটাই বলেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ছয় সপ্তাহ পর বাস্তবতা পুরো ভিন্ন ছবি দেখাচ্ছে।
ইরানের প্রতিরোধ থামেনি। বরং ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়ছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে। মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এমনকি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরান কোনো দুর্বল সমঝোতায় রাজি হয়নি। বরং তারা ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রয়োজন হলে দীর্ঘ সময় ধরে এই সংঘাত চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন আর বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সংকট এখন আর সামরিক নয় এটি কৌশলগত। দ্য গার্ডিয়ানের নাসরিন মালিক লিখেছেন, এই সংঘাত দীর্ঘ হয়েছে কারণ যুক্তরাষ্ট্র এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি, যাকে তারা ঠিকভাবে বোঝেনি।
ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, যুদ্ধের লক্ষ্য থাকলেও শেষটা কেমন হবে তা পরিষ্কার নয়।
যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ছিল স্পষ্ট এবং আত্মবিশ্বাসে ভরা। লক্ষ্য ছিল সীমিত সময়ের মধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে ভেতর থেকে পরিবর্তন আনা।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই পরিকল্পনাকে উপস্থাপন করা হয়েছিল একটি ‘সুনির্দিষ্ট ও অপ্রতিরোধ্য’ সামরিক অভিযান হিসেবে। ধারণা ছিল, দ্রুত আঘাতের মাধ্যমে ইরানকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে তারা প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারবে না।
ওয়াশিংটন পোস্টের ভাষায়, এই পরিকল্পনার পেছনে ছিল একটি বড় অনুমান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি এতটাই প্রভাবশালী যে, প্রতিপক্ষ দীর্ঘ সময় টিকতে পারবে না।
বিশ্লেষক ব্রেট স্টিফেন্স ওয়াশিংটন পোস্টে লিখেছেন, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যেতে পারে এমন আশাবাদই তখন প্রাধান্য পেয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের শুরুতেই সেই ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ইরান সরাসরি বড় সংঘর্ষে না গিয়ে ধীরে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আঘাত শুরু করে। তারা এমন কৌশল নেয়, যা দ্রুত পরাজয়ের বদলে দীর্ঘ প্রতিরোধের দিকে যায়।
ছয় সপ্তাহের মাথায় এসে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো ইরান ভেঙে পড়েনি। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরান এমন এক কৌশল নিয়েছে, যেখানে তারা সরাসরি জয় নয়, বরং প্রতিপক্ষের খরচ বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে। তারা ধারাবাহিকভাবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যা তুলনামূলকভাবে কম খরচে বড় প্রভাব ফেলছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ধরনের আক্রমণ গালফ অঞ্চলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে। জ্বালানি স্থাপনা, বন্দর এবং পরিবহন ব্যবস্থা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল পরিবাহিত হয়। এটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, এই পরিস্থিতি শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক চাপও তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও এর প্রভাব অনুভব করছে। এর পাশাপাশি, ইরান যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার মতো সক্ষমতা দেখিয়েছে, যা তাদের প্রতিরোধের মাত্রা বোঝায়। সব মিলিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার এই যুদ্ধ এখন আর একতরফা নেই।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসছে শেষটা কোথায়? দ্য গার্ডিয়ানের নাসরিন মালিক লিখেছেন, এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে কীভাবে সম্মান রক্ষা করে এই সংঘাত থেকে বের হওয়া যায়।
ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে অনেক কথা বলা হলেও, শেষের চিত্র স্পষ্ট নয়। এই অনিশ্চয়তা কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, যখন কোনো পক্ষই স্পষ্টভাবে জানে না যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, তখন সংঘাত দীর্ঘ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
এই প্রসঙ্গে মার্কিন জেনারেল ডেভিড পেট্রেয়াসের সেই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে আমাকে বলেন, কেমন করে এটি শেষ হবে। এটি এখন শুধু একটি প্রশ্ন নয়। এটি পুরো যুদ্ধের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
নাসরিন মালিক দ্য গার্ডিয়ানে লিখেছেন, এই যুদ্ধের মূল সমস্যা একটি ইরানকে ভুলভাবে বোঝা। যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করেছিল, ইরান চাপের মুখে দ্রুত নতিস্বীকার করবে। কিন্তু বাস্তবে ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মধ্যে থেকে নিজেদের এমনভাবে গড়ে তুলেছে, যেখানে টিকে থাকাই তাদের প্রধান কৌশল।
রয়টার্সের বিশ্লেষণেও একই কথা বলা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ইরান সরাসরি সামরিক জয়ের জন্য লড়ছে না। তারা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে যুদ্ধ দীর্ঘ হয় এবং প্রতিপক্ষের খরচ বাড়ে। ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, এই ধরনের কৌশলকে অবমূল্যায়ন করাই যুক্তরাষ্ট্রের বড় ভুল।
যুদ্ধের প্রভাব এখন বৈশ্বিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। রয়টার্স জানায়, তেলের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের পুরোপুরি পাশে পায়নি। ইউরোপ ও গালফ দেশগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দ্য গার্ডিয়ান উল্লেখ করেছে, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করছে।
ছয় সপ্তাহ পর এসে একটি বিষয় পরিষ্কার এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার নয়। দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স এবং ওয়াশিংটন পোস্ট একই দিকে ইঙ্গিত করছে। প্রথমত ইরান টিকে আছে। দ্বিতীয়ত যুদ্ধ বিস্তৃত হচ্ছে। তৃতীয়ত এর খরচ বাড়ছে এবং চতুর্থত এর সমাধান নেই। সবচেয়ে বড় কথা শেষটা কীভাবে হবে, তা কেউ জানে না।