একের পর এক পরিচালকের পদত্যাগ, ক্রমেই লম্বা হচ্ছে তালিকা। এই পদত্যাগের স্রোতে যুক্ত হতে পারে আরও কিছু নাম। এমন পরিস্থিতিতে জটিল হয়ে উঠছে বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের ভেতরের সমীকরণ। পরিচালকদের পদত্যাগের সঙ্গে ভেতরের অসন্তোষ আর তদন্ত প্রতিবেদনের চাপ সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এখন যেন অস্থির মোড়ে দাঁড়িয়ে। এমন পরিস্থিতিতেও শেষ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল; যদিও তার নেতৃত্বাধীন বোর্ডের ভবিষ্যৎ ঘিরে অনিশ্চয়তা ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে।
মার্চের শেষদিকে মেলবোর্ন থেকে দেশে ফেরার পর থেকেই বোর্ডের কার্যক্রমে সক্রিয় বুলবুল। মিরপুরে বিসিবির চতুর্থ বোর্ড সভায় প্রায় ৯ ঘণ্টা কাটানোর পরদিনই তিনি হাজির হন শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে, জাতীয় দলের অনুশীলন পর্যবেক্ষণে। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে চাপ বাড়ছে তার ওপর।
সাম্প্র্রতিক বিসিবির সাতজন পরিচালক পদত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে গত তিন সপ্তাহেই সরে দাঁড়িয়েছেন ছয়জন আর সর্বশেষ বোর্ড সভার পরই পদত্যাগ করেছেন চারজন পরিচালক। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে সবাই ‘ব্যক্তিগত কারণ’ দেখিয়েছেন, তবে ভেতরের গল্প ভিন্ন।
সদ্য সাবেক হওয়া এক পরিচালক জানিয়েছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিচালকদের মতামত না নেওয়া, তাদের মতামতের গুরুত্ব না দেওয়া, যেকোনো বিষয়ে আলোচনা ছাড়াই বিভিন্ন পরিবর্তন আনা এবং রাজনৈতিক সমর্থনের অভাবে নিজেদের একঘরে মনে করার মতো বিষয়গুলোই মূল অসন্তোষের কারণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই সাবেক পরিচালক বলেন, ‘সাম্প্রতিক যা ঘটেছে তা খুবই দুঃখজনক। বোর্ড সভাপতি নিজের মতো করেই সবকিছু পরিচালনা করতে চান। তিনি যদি আমাদের মতামত না-ই নেন, তা হলে এই বোর্ডে আমাদের ভূমিকা কী আর কেনই বা থাকব?’
এই অস্থিরতার মাঝেই নতুন করে চাপ তৈরি করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে (এনএসসি) জমা পড়া তদন্ত প্রতিবেদন। গত বছরের বিসিবি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছে, যেখানে নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে কিছু সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান সাবেক বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা কাউকে অভিযুক্ত না করে একটি নিরপেক্ষ প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এটি নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করেছে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ করেছে।’
এদিকে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানিয়েছেন, সরকার বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। রোববার বিকেএসপি পরিদর্শনে গিয়ে গণমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘রোববার সকালে প্রতিবেদনটি জমা হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এটি নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা আইসিসিকে অবহিত করব এবং এরপর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’
তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিসিবির সাবেক পরিচালক সিরাজ উদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর সময়ের আলোকে জানিয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ চাইলে যেকোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারে।
অর্থাৎ, আলমগীরের মতে যেকোনো সময় বোর্ড ভেঙে দিতে পারে ক্রীড়া পরিষদ, ‘আইসিসির কোনো কিছু করার নেই। আইসিসি “ল অব দ্য ল্যান্ড” নিয়ে কখনো তাদের ইন্টারভেনশন নেই। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বিধিমালা ২০১৮ দ্বারা পরিচালিত অধ্যাদেশ বা যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কোনো বিধিমালাতে এটি নেই যে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিতে হবে। আইনে নেই এটা। বাট এর মানে কমিটি ভাঙার ক্ষমতা আইনে বাংলাদেশের আইন যেটা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন এটা জাতীয় সংসদ অনুমোদিত আইন দ্বারা স্বীকৃত। সুতরাং “ল অব দ্য ল্যান্ড”-এর ব্যাপারে আইসিসি না, কোনো হায়ার বডির কোনো কিছু করার নেই।’
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন বিসিবির জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক চাপ এবং তদন্তের ফলাফল সবকিছুই প্রভাব ফেলতে পারে বোর্ডের ভবিষ্যতের ওপর। তবে এতকিছুর পরও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন সভাপতি বুলবুল।
পরিচালকদের পদত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন, ‘সবার শেষে যাওয়ার ব্যক্তিটি হব আমিই।’
বিসিবি সভাপতির এমন বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে সিরাজ উদ্দিন আলমগীর বুলবুলকে ‘পদলোভী’ উল্লেখ করে বলেন, ‘সে বসে থাকার ক্ষমতা রাখেন না, বোর্ড ভেঙে দিলে তো আর বসে থাকার কোনো ক্ষমতা থাকবে না। কিন্তু এটা হচ্ছে তিনি যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভালো চান না, মানে একটা বোর্ডের সাতজন সদস্য পদত্যাগ করছে। ৭৩টি ক্লাবের মধ্যে ৬৩টি ক্লাব আমার বিরুদ্ধে। ৬৪ জেলা, আট বিভাগ আমার বিরুদ্ধে। অল স্টেকহোল্ডারস আমার বিরুদ্ধে। সুতরাং আমি আর এই পদে কন্টিনিউ করতে চাই না। এটা কোনো সভ্য দেশে যদি হতো, এটা যদি কোনো উন্নত দেশের উন্নত আদর্শের লোক হতো এই কাজটাই করত। হি উড হ্যাভ রিজাইনড। কিন্তু এটা না বলে তিনি বলছেন ‘আই অ্যাম দ্য লাস্ট ম্যান’।
অর্থাৎ তিনি পদলোভী হিসেবে এখানে আসছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট ধ্বংস হয়ে যাক তার কোনো কিছু যায়-আসে না। এটার বহিঃপ্রকাশ।’
সিরাজ উদ্দিন আরও বলেন, ‘একটা বোর্ডের বিরুদ্ধে তার দেশ, তার সরকার, তার পছন্দের সরকার ক্ষমতায় আসেনি। সে যার শেল্টার নিয়েছিল, সেই শেল্টারের বিপক্ষে একটা সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এখন সে যে বোর্ডটা চালাবে, ক্রিকেট বোর্ড চালাতে গেলে তো সরকারের সহযোগিতা লাগবে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা লাগবে। সে এটা ভালো করে জানে যে, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে এখন যিনি মন্ত্রী হয়েছেন বা এখন যে প্রশাসন, এটা কমপ্লিটলি তার বিরুদ্ধে। তারা ওই নির্বাচনের আগে-পরে সরাসরি তার বিরুদ্ধে স্টেটমেন্ট দিয়েছে।’ এটাই তার দেশের ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটত, যে আমাকে দিয়ে আর এই ক্রিকেট আগানো সম্ভব নয়, আমাকে রাষ্ট্র চায় না, প্রশাসন চায় না, আমার স্টেকহোল্ডাররা চায় না।’
অস্থিরতার ভেতর দিয়েই কি স্থিতিশীলতার পথে ফিরতে পারবে বিসিবি, নাকি সামনে আরও বড় কোনো পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে দেশের ক্রিকেট প্রশাসন।