বৈশাখ : পোশাকে রঙের খেলা

তাসলিমা নীলু

ফিচার

বৈশাখী সাজে নারীদের বরাবরের মতোই এবারও প্রধান আকর্ষণ সুতি শাড়ি। তবে এবার লাল-সাদার চিরচেনা গণ্ডি পেরিয়ে ফ্যাশন হাউসগুলো মেতেছে প্যাস্টেল

2026-04-07T15:21:17+00:00
2026-04-07T15:21:17+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ফিচার
বৈশাখ : পোশাকে রঙের খেলা
তাসলিমা নীলু
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:২১ পিএম 
পোশাকে রঙের খেলা। ছবি : সংগৃহীত
বৈশাখী সাজে নারীদের বরাবরের মতোই এবারও প্রধান আকর্ষণ সুতি শাড়ি। তবে এবার লাল-সাদার চিরচেনা গণ্ডি পেরিয়ে ফ্যাশন হাউসগুলো মেতেছে প্যাস্টেল শেড, বাসন্তী, ফিরোজা এবং উজ্জ্বল মেরুন রঙের খেলায়। দেশীয় ফ্যাশন হাউসসহ অন্যান্য ব্র্যান্ডগুলোও এবার ব্লকের কাজ, স্ক্রিন প্রিন্ট এবং হাতের ভরাট কাজের শাড়ির ওপর জোর দিয়েছে। আবহাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে কাপড়ের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে সুতি, লিনেন এবং ভয়েল। কামিজের কাটিংয়ের ক্ষেত্রে এবার এসেছে পরিবর্তন। লং কুর্তির চেয়ে মিড-লেংথ বা শর্ট কুর্তির চল বেশি দেখা যাচ্ছে।

ওড়নায় ব্যবহার করা হয়েছে টাই-ডাই আর ঝালরের কাজ। এ ছাড়া এবার ফ্লোরাল মোটিফের পাশাপাশি লোকজ মোটিফ, যেমন- হাতি, ঘোড়া, পালকি এবং রিকশা পেইন্টের ব্যবহার নারী পোশাকে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। সেইলর, লা রিভ, সাদাকালো, রঙ বাংলাদেশ, সাতকাহনসহ আরও অনেক ফ্যাশন হাউস ফ্যামিলি ম্যাচিং পোশাককে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

রঙ বাংলাদেশের বৈশাখ আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ফ্যামিলি ম্যাচিং পোশাক। বাবা-মা, ছেলেমেয়েসহ পুরো পরিবার একই রং ও থিমে নিজেদের সাজিয়ে নিতে পারবে বৈশাখের আনন্দে কাপল, ডুয়েট কিংবা ফ্যামিলি সিরিজের আদলে। পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে রাঙিয়ে তুলে উৎসবকে করে তুলবে আরও উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। এ ছাড়া রঙ বাংলাদেশ বাংলা নববর্ষের আবহকে নান্দনিকভাবে তুলে ধরতে এবারের বৈশাখী সংগ্রহ সাজিয়েছে দুটি বিশেষ থিমে বৈশাখী মেলা এবং শিল্পগুরু সফিউদ্দিন আহমেদের শিল্পকর্ম। এই দুই থিমের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষের প্রাণময় আবহ, লোকজ ঐতিহ্য ও শৈল্পিক ভাবনাকে পোশাকের নকশায় তুলে ধরা হয়েছে।

ফ্যাশন ডিজাইনার ও বিশ্বরঙের কর্ণধার বিপ্লব সাহা বলেন, ‘এবারের বৈশাখে পোশাক অলংকরণের অনুষঙ্গ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে টেপা পুতুল এবং প্রকৃতির রং-রূপের বিভিন্ন ফর্মকে। বাংলার মাটির তৈরি টেপা পুতুল শুধু একটি খেলনা নয়, এটি আমাদের গ্রামীণ শিল্প, সরল জীবনধারা এবং লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক। সেই ঐতিহ্যের রূপ, রং ও ভাবনাকে আধুনিক ফ্যাশনের ভাষায় তুলে ধরতেই আমাদের এই  বিশেষ প্রয়াস। পোশাকগুলোর নকশায় থাকছে প্রকৃতির স্বাভাবিক রঙের ব্যবহার, মাটির লাল, পাতা সবুজ, আকাশি নীল এবং ফুলের কোমল আভা। কাপড়ের বুনন, মোটিফ ও অলংকরণে প্রতিফলিত হবে টেপা পুতুলের সরলতা, লোকজ নকশা এবং বাংলার প্রকৃতির সৌন্দর্য।’
আরও পড়ুন

অন্যদিকে ফ্যাশান হাউসকে ক্রাফট জানায়, ‘পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এবার তারা লোকজ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মোটিফ, নকশিকাঁথা, কাঁথা স্টিচ, কাশ্মিরি, ইক্কাত, ট্র্যাডিশনাল, আল্পনা, রিকশা আর্ট, বিউটি অব রাগস এবং মিক্সড মোটিফের অনুপ্রেরণায় বৈশাখী পোশাক এনেছে। এসব মোটিফ ফুটিয়ে তুলতে হাতের কাজ, এমব্রয়ডারি, কারচুপি, স্কিন ও ব্লক প্রিন্ট, ডিজিটাল প্রিন্ট এবং টাইডাই মিডিয়া ব্যবহার করেছে।’

অনলাইন পেজ শখের ডিব্বার কর্ণধার হুমায়রা সুলতানা বলেন, ‘ঈদের পরপর বৈশাখের আগমনি বিধায় ঈদের প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গেই বৈশাখের প্রস্তুতি ও বেচাকেনা একই সঙ্গে চলেছে শখের ডিব্বায়। বৈশাখের আয়োজনে এবার টাঙ্গাইল সিল্কের ওপর ডিজিটাল প্রিন্টে কাজ করেছি যা একসময় বাংলার ঐতিহ্য, প্রকৃতি, উৎসবের প্রতীক ছিল। শাড়িটার নামই আমরা দিয়েছি ‘উৎসব’। শাড়িটি কালো হলেও সবার পছন্দ হয়েছে। সাধারণত এমন উৎসবে সাদা-লাল প্রাধান্য পেলেও ক্রেতারা এই শাড়িটি ভীষণ ভালোবেসে আপন করে নিয়েছেন। তা ছাড়া সাদার মাঝে ফ্লোরাল মোটিফের খুব ক্লাসি শাড়ির কালেকশনও রেখেছি আমরা। বৃষ্টি বন্দনার সঙ্গী হতে সাদায় নীল মোটিফেও শাড়ি করা হয়েছে। এ ছাড়া এবারে হ্যান্ডলুম গামছা শাড়ি খুব বেশি চাহিদা দেখতে পাচ্ছি আমরা। অনেক রঙের গামছা শাড়ির আয়োজন রেখেছি আমরা।’

এবারের বৈশাখে শাড়ির পাশাপাশি ব্লাউজের কাটিংয়েও এসেছে নতুনত্ব। স্মকি ব্লাউজ, জ্যাকেট স্টাইল ব্লাউজ এবং পেপলাম ব্লাউজ সবার খুব পছন্দ। আরও আছে পাফ সিøভ, বেল স্লিভ, বোট নেক, টাই আপ ব্লাউজ ইত্যাদি।

পুরুষের ফ্যাশনে ভিন্নতা
পুরুষের বৈশাখী পোশাক মানেই যেন পাঞ্জাবি। তবে গতানুগতিক পাঞ্জাবির বাইরে এবার ভিন্নধর্মী কলার ও স্লিভের কাজ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফ্যাশন হাউসগুলো এবার পাঞ্জাবিতে জিওমেট্রিক মোটিফ এবং লোকজ বাদ্যযন্ত্রের নকশা ফুটিয়ে তুলেছে। এ ছাড়া ব্লক, স্ক্রিন প্রিন্ট এবং হালকা এমব্রয়ডারির কাজের পাঞ্জাবিও রয়েছে। কাপড়ের ক্ষেত্রে হ্যান্ডলুম কটন এবং অ্যান্ডি সুতি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। ফ্যাশন হাউস আড়ং এবার সুতির পাশাপাশি এনেছে সিল্কের পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির পাশাপাশি গরমের আরাম হিসেবে শর্ট পাঞ্জাবি বা ফতুয়ার চাহিদাও অনেক।

রঙের ক্ষেত্রে সাদার ওপর লাল কাজ, নীল কিংবা অফ হোয়াইট পাঞ্জাবিগুলো এবার বেশি নজর কাড়ছে। অনেক ফ্যাশন সচেতন পুরুষ পাঞ্জাবির সঙ্গে ধুতি বা পায়জামার পাশাপাশি এখন জিন্স বা গ্যাবার্ডিন প্যান্টও বেছে নিচ্ছেন নিজেকে ক্যাজুয়াল লুক দেওয়ার জন্য।

ফ্যাশন ডিজাইনার লা রিভের পাঞ্জাবি বিভাগের ডিজাইনার খালিদ হাসান খান বলেন, পাঞ্জাবিতে এবার আমরা ‘মিনিমালিস্ট’ বা পরিমিতিবোধের ওপর জোর দিয়েছি। খুব বেশি জমকালো কাজ নয়, বরং ফেব্রিক টেক্সচার এবং প্যাটার্ন ভেরিয়েশনই এবারের মূল আকর্ষণ। বিশেষ করে গরমের কথা মাথায় রেখে লিনেন-কটন ব্লেন্ড এবং ভয়েল কাপড়ে পাঞ্জাবিগুলো তৈরি করা হয়েছে। কলারে হালকা এমব্রয়ডারি আর বোতামের প্লেটে কন্ট্রাস্ট থ্রেড ওয়ার্কের মাধ্যমে আমরা সাধারণ পাঞ্জাবিতেও একটি অভিজাত লুক দেওয়ার চেষ্টা করেছি, যা নববর্ষের সকালে যে কাউকে স্নিগ্ধতা দেবে।

বসুন্ধরা সিটি শপিংমলে কেনাকাটা করতে এসেছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা আবরার জাহিন। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে বৈশাখী পোশাক মানেই আভিজাত্য আর শেকড়ের টান। এবার দেখছি পাঞ্জাবির কাট ও ফিটিংয়ে বেশ বৈচিত্র্য এসেছে। বিশেষ করে হাতের কাজ বা এমব্রয়ডারির চেয়ে ব্লকিং এবং ডিজিটাল প্রিন্টের আধিক্য তরুণদের পোশাকে এক অন্যরকম আধুনিকতা যোগ করেছে।’

শিশুদের পোশাকে রঙের উৎসব
শিশুদের জন্য বৈশাখী পোশাক মানেই যেন এক টুকরো রংধনু। বড়দের পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে শিশুদের জন্যও ফ্যামিলি কম্বো সেট এবার অনেক ফ্যাশন হাউসের মূল আকর্ষণ। তবে শিশুদের কোমল ত্বকের কথা মাথায় রেখে ফ্যাশন হাউসগুলো শতভাগ সুতি ও নরম কাপড় ব্যবহার করেছে। মেয়েশিশুদের জন্য এসেছে রঙিন ফ্রক, ঘাঘরা চোলি এবং ছোট শাড়ি। আর ছেলেশিশুদের জন্য পাঞ্জাবি আর ধুতির সেট এবারও ট্রেন্ডে। লাল, হলুদ, কমলা ও সবুজ- শিশুদের পোশাকে এই উজ্জ্বল রংগুলোই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। বিশেষ করে আল্পনার নকশা এবং গ্রামীণ মেলা থেকে অনুপ্রাণিত মোটিফগুলো শিশুদের পোশাকে এক প্রাণবন্ত ভাব ফুটিয়ে তুলেছে।

ফ্যাশন হাউস সেইলরের কিডজ সেকশনের সিনিয়র ফ্যাশন ডিজাইনার শায়লা শারমীন নূর বলেন, ‘বৈশাখের তপ্ত দুপুরে শিশুদের জন্য পোশাক নির্বাচনের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত আরাম। আমরা এবার পোশাকে হাতের কাজের বদলে ব্লক প্রিন্ট ও স্ক্রিন প্রিন্টকে গুরুত্ব দিয়েছি, যাতে সুতার ঘর্ষণে শিশুর ত্বকে অস্বস্তি না হয়। বিশেষ করে উজ্জ্বল বাসন্তী ও লাল রঙের পাশাপাশি আমরা হালকা আকাশি ও প্যাস্টেল শেড ব্যবহার করেছি যা চোখের প্রশান্তি দেয়। কাটিংয়ে ঘেরওয়ালা ঢিলেঢালা নকশা রাখা হয়েছে যাতে বাতাস চলাচল সহজ হয়।’

অন্যদিকে ফ্যাশান হাউস অম্বরের ডিজাইনার জামাল মোস্তফা বলেন, ‘শিশুদের বৈশাখী পোশাক তৈরির সময় আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ থাকে উৎসবের আমেজ আর বাচ্চার স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। যেহেতু বৈশাখে প্রচণ্ড গরম থাকে, তাই আমরা কুর্তি, আনারকলি, কুচি দেওয়া ফ্রকের ওপর ব্লক, স্ক্রিন প্রিন্ট এবং হাতের কাজকে প্রাধান্য দিয়েছি। সিন্থেটিক এড়িয়ে শুধু অর্গানিক কটন ও ভয়েল কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে সারা দিন দৌড়ঝাঁপ করলেও শিশুরা ক্লান্ত না হয়।’

সন্তানদের জন্য বৈশাখী পোশাক কিনতে যমুনা ফিউচার পার্কে গিয়েছিলেন ফারহানা হক। তিনি বলেন, ‘বাচ্চাদের জন্য আমরা সবসময় সুতির কাপড় খুঁজি। এবার বৈশাখী পোশাকে অনেক রঙিন ও ছোট ছোট মোটিফের কাজ দেখছি, যা বাচ্চাদের বেশ মানাবে। সবচেয়ে বড় কথা, এবার অনেক ফ্যাশন হাউস তাদের পোশাকে নমনীয়তা এবং খোলামেলা কাটিং রেখেছে, যা বৈশাখের গরমে বাচ্চাদের জন্য খুব আরামদায়ক হবে।’

সামগ্রিকভাবে এবারের বৈশাখী ফ্যাশন প্রথাগত রীতিনীতিকে ছাড়িয়ে আধুনিক ও ব্যবহারিক হয়ে উঠেছে। দেশি ফ্যাশন হাউসগুলো যেমন আমাদের দেশীয় তাঁতশিল্পকে বিশ্বমানের ফ্যাশনে রূপান্তরিত করছে, তেমনি সাধারণ মানুষও নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক সাজে সাজতে ভালোবাসছে। বৈশাখ কেবল একটি দিন নয়, এটি আমাদের জাতিসত্তার পরিচয়। আর এই পরিচয়ের একটি বড় অংশজুড়ে আছে আমাদের পোশাক পরিচ্ছদ, যা এ বছরও ফ্যাশন হাউসগুলোর সৃজনশীলতায় হয়ে উঠেছে অনবদ্য।

এএডি/


  বিষয়:   পোশাক  রঙ  খেলা  বৈশাখ 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: