মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দিয়েছে, তখন সেই অস্থিরতার সুযোগে নতুন এক অর্থনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চ হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। ইরান ও চীন একসঙ্গে কাজ করছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের একাধিপত্য কমাতে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি যাতায়াত করে এই জলপথ দিয়ে, আর সেই নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করেই ইউয়ানকে বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে।
ইতিমধ্যে কিছু জাহাজ ইউয়ানে টোল পরিশোধ করেছে, আলোচনা হচ্ছে ‘পেট্রো-ইউয়ান’ নিয়ে, আর বিশ্লেষকদের মতে, এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে; যদিও পথটি এখনও কঠিন ও দীর্ঘ।
ডলারের বিরুদ্ধে হরমুজ হাতিয়ার : ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযান এক মাসের বেশি সময় ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর সাময়িক স্বস্তি এলেও এই সময়টিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে তেহরান ও বেইজিং। তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ডলারের আধিপত্যকে ব্যবহার করে ওয়াশিংটন রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি হয়ে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
কারণ বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। জেপি মরগান চেজের ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ব তেল বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই ডলারে হয়। ফলে এই প্রবাহে পরিবর্তন আনতে পারলে বৈশ্বিক অর্থনীতির কাঠামোতেই প্রভাব পড়তে পারে।
ইউয়ানে টোল আদায় ও নতুন লেনদেন ব্যবস্থা : একাধিক সূত্রে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে ইরান ট্রানজিট ফি আদায় শুরু করেছে এবং তা ইউয়ানে নেওয়া হচ্ছে।
লয়েডস লিস্ট জানিয়েছে, মার্চের শেষ পর্যন্ত অন্তত দুটি জাহাজ এই পদ্ধতিতে অর্থ পরিশোধ করেছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও পরোক্ষভাবে বিষয়টি স্বীকার করেছে। এমনকি ইরানে জিম্বাবুয়ে দূতাবাস ‘পেট্রো-ইউয়ান’ চালুর সম্ভাবনার কথা বলেছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তেহরান বা বেইজিং বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেনি।
টিআরএম ল্যাবসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শুধু ইউয়ান নয়, ভবিষ্যতে ডিজিটাল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমেও এই ধরনের টোল আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে লেনদেন করা আরও সহজ হতে পারে। বিশেষ করে ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকায় বিকল্প আর্থিক পথ খুঁজছে।
চীনের কৌশল ও বৈশ্বিক প্রভাব : চীনের লক্ষ্য শুধু ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য নয়, বরং বৃহত্তর পরিসরে একটি বহুমেরু আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। লোই ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান সংকট চীনের কূটনীতির জন্যও একটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে তারা মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা চায়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমানোর সুযোগও খুঁজছে। ২০২১ সালের ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তির পর ইরান-চীন বাণিজ্য দ্রুত বেড়েছে।
ইরানের তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কেনে চীন এবং তা মূলত ইউয়ানে লেনদেন হয়। এর ফলে চীন কম দামে তেল পায়, আর ইরান ডলার-নির্ভরতা কমাতে পারে।
ডলারের শক্ত অবস্থান : আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ৫৭ শতাংশ এখনও ডলারে, যেখানে ইউয়ানের অংশ মাত্র ২ শতাংশ। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার ২০২৪ সালে ৩.৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের তুলনায় বাড়লেও এখনও অনেক কম।
ন্যাটিক্সিসের অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো মনে করেন, শুধু হরমুজে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ালেই বিশ্ব ডলারমুক্ত হবে না। উপসাগরীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়।
তারপরও অর্থনীতিতে বহুমেরু ব্যবস্থার ইঙ্গিত : বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সহসাই ডলারের আধিপত্য ভাঙা না গেলেও, এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে একমেরু থেকে বহুমেরু ব্যবস্থায় নিতে পারে। ব্রিটেনের কিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বুলেন্ত গোকায় বলেন, পেট্রোডলারের আধিপত্য ভাঙা এখন ইরানের কাছে জরুরি। তবে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউয়ানের ব্যবহার বাড়লেও এটি এখনও ডলারের বিকল্প হিসেবে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কারণ ইউয়ান পুরোপুরি মুক্তভাবে লেনদেনযোগ্য নয় এবং চীনের আর্থিক ব্যবস্থায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি।
ন্যাটিক্সিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ (এশিয়া-প্যাসিফিক) অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরোও সম্প্রতি আলজাজিরাকে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে ইউয়ানের ব্যবহার অবশ্যই একটি প্রতীকী পরিবর্তন, কিন্তু এটিকে ডলারের আধিপত্যের সরাসরি বিকল্প হিসেবে দেখা এখনই ঠিক হবে না। তবে এটি স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছেÑ জ্বালানি বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।’
যুদ্ধ, কূটনীতি ও ভবিষ্যৎ : দ্য ইন্টারসেপ্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি হলেও এই সংঘাত মূলত বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরাইল এবং চীনের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের লড়াই চলছে। বিশ্লেষক কেনেথ রোগফ মনে করেন, ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানো ইরানের জন্য কৌশলগত পদক্ষেপ, যা একদিকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপের মুখে ফেলবে।
ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি ও চীনের সক্ষমতা : ইউরোপীয় বিশ্লেষক হোসুক লি-মাকিয়ামা বলেন, চীন ইরানের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার হওয়ায় এই সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ। ইরান তার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও শিল্পপণ্য চীন থেকেই পায়।
তিনি আরও বলেন, অতীতে ইউরোপ বা জাপানের মুদ্রা ডলারের বিকল্প হতে পারেনি, কারণ তারা তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর চাহিদা পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু চীন এখন বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে সেই সক্ষমতা অর্জন করেছে।
ধীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত : বিশ্লেষক ড্যান স্টেইনবক মনে করেন, স্বল্পমেয়াদে ডলারকে সরানো সম্ভব নয়, তবে ইউয়ানের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ধীরে ধীরে মার্কিন আধিপত্য কমিয়ে দেবে। এটি হঠাৎ কোনো পরিবর্তন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া। কেনেথ রোগফের মতে, ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে যুদ্ধের ফলাফলের ওপর। যদি ইরান ও চীন সফল হয়, তবে অনেক দেশ ডলার-নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করবে।
এফআর