ইসলামে নারীর প্রকৃত মর্যাদা

আব্দুল্লাহ আল মাহদী

ইসলাম

ইসলামের ইতিহাসকে সাধারণত পাঁচটি যুগে ভাগ করা হয়- জাহেলি যুগ (ইসলামপূর্ব যুগ), ইসলামি যুগ, আব্বাসীয় যুগ, উসমানীয় যুগ এবং রেনেসাঁ

2026-04-10T13:00:04+00:00
2026-04-10T13:00:04+00:00
 
  বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
ইসলামে নারীর প্রকৃত মর্যাদা
আব্দুল্লাহ আল মাহদী
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ১:০০ পিএম 
ইসলামপূর্ব জাহেলি সমাজে নারীরা ছিল চরম অবহেলার পাত্র। ছবি : সংগৃহীত
ইসলামের ইতিহাসকে সাধারণত পাঁচটি যুগে ভাগ করা হয়- জাহেলি যুগ (ইসলামপূর্ব যুগ), ইসলামি যুগ, আব্বাসীয় যুগ, উসমানীয় যুগ এবং রেনেসাঁ পরবর্তী যুগ। ইসলামপূর্ব জাহেলি সমাজে নারীরা ছিল চরম অবহেলার পাত্র। তাদের ছিল না কোনো সামাজিক মর্যাদা, ছিল না সম্মানজনক অবস্থান, বরং তাদের পরিবার ও সমাজের জন্য বোঝা মনে করা হতো। এমন অমানবিক ও অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে আগমন ঘটে মহামানব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর। তিনি শুধু একজন নবীই নন, তিনি ছিলেন এক যুগান্তকারী বিপ্লবী, মানবতার মুক্তিদূত এবং সমাজ সংস্কারক, যিনি অজ্ঞতার অন্ধকার চিরে মানবতার আলোর প্রদীপ প্রজ্বালন করেন।

নারী যখন ছোট কন্যাশিশু : জাহেলিয়াতের যুগে কন্যাশিশুর জন্মকে লজ্জা ও অপরাধ হিসেবে দেখা হতো। অনেক ক্ষেত্রে কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, আর তার মায়ের ওপর নেমে আসত অকথ্য নির্যাতন। ঠিক সেই সময়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) এই ঘৃণ্য প্রথার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর হারাম করেছেন মায়ের অবাধ্যতা, কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া, কারও প্রাপ্য না দেওয়া এবং অন্যায়ভাবে কিছু গ্রহণ করা; আর অপছন্দ করেছেন অনর্থক বাক্যব্যয়, অতিরিক্ত প্রশ্ন করা এবং সম্পদ অপচয় করা’ (বুখারি : ২৪০৮)। 

Advertisement
তিনি আরও বলেন, ‘যার ঘরে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করল, অতঃপর সে তাকে কষ্ট দেয়নি, তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়নি এবং পুত্রসন্তানকে তার ওপর প্রাধান্য দেয়নি, তা হলে ওই কন্যার কারণে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন’ (মুসনাদে আহমাদ : ১/২২৩)। আরও একটি হাদিসে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুই কন্যাসন্তানকে লালন-পালন করেছে এবং তাদের উত্তমভাবে বিয়ে দিয়েছে; সে এবং আমি জান্নাতে এভাবে একসঙ্গে থাকব।’ এই কথা বলে তিনি নিজের দুই আঙুল একত্র করে দেখান। (তিরমিজি : ১৯১৪)

নারী যখন পরামর্শদাতা : জাহেলি সমাজে নারীর মতামতের কোনো মূল্য ছিল না। পারিবারিক, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো বিষয়ে তাদের পরামর্শ গ্রহণ করা তো দূরের কথা, তাদের কথা শোনাও অপ্রয়োজনীয় মনে করা হতো। কিন্তু ইসলামে এই ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ জীবনে নারীর মতামতের গুরুত্ব প্রদর্শন করেছেন। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর স্ত্রী হজরত উম্মে সালামা (রা.)-এর সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন (সহিহ বুখারি : ২৭৩১)। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও পরামর্শমূলক ভূমিকা স্বীকৃত ও সম্মানিত।

নারী যখন অপবাদের শিকার : মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার সম্মান। আর নারীর ক্ষেত্রে এই সম্মান আরও বেশি সংবেদনশীল। তাই ইসলাম নারীর সম্মান রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা সচ্চরিত্রা, সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত; আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি’ (সুরা নুর : ২৩)। আরও বলা হয়েছে,‘যারা সচ্চরিত্র নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাদের আশিটি বেত্রাঘাত করো এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না; তারাই ফাসিক’ (সুরা নুর : ৪)। 

ইতিহাসে আমরা দেখি, হজরত আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে মুনাফিকরা অপবাদ রটালে আল্লাহ তায়ালা কুরআনের আয়াত নাজিল করে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, নারীর সম্মান রক্ষায় ইসলামের অবস্থান কত দৃঢ়। রাসুল (সা.) আরও সতর্ক করে বলেন, ‘সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে বেঁচে থাকো, যার একটি হলো সতী-সাধ্বী মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ দেওয়া।’ (সহিহ বুখারি : ২৭৬৬)

নারী যখন অন্যের স্ত্রী : যে সমাজে নারীদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখা হতো, ইসলাম সেখানে তাদের মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পুরো দুনিয়াই সম্পদ, আর দুনিয়ার মধ্যে সর্বোত্তম সম্পদ হলো পুণ্যবতী স্ত্রী’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৫)। 

তিনি আরও বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম; আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম’ (তিরমিজি : ৩৮৯৫)। এতে বোঝা যায়, ইসলামে দাম্পত্য সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা ও সদাচরণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।

নারী যখন একজন মা : ইসলামে মাতৃত্বের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি জিগ্যেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার উত্তম আচরণের সর্বাধিক হকদার কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ তিনি আবার জিগ্যেস করলেন, ‘তারপর কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ 

তিনি আবার জিগ্যেস করলেন, ‘তারপর কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ তিনি আবার জিগ্যেস করলেন, ‘তারপর কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার পিতা’ (বুখারি ও মুসলিম)। এই হাদিসে মায়ের মর্যাদা তিনগুণ বেশি প্রদর্শিত হয়েছে। এ ছাড়া সিরাত থেকে জানা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর দুধমাতা হালিমা (রা.)-এর প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করতেন এবং তাঁর জন্য নিজের চাদর বিছিয়ে দিতেন।

নারী যখন সম্পদের হকদার : ইসলাম নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রদান করেছে। একজন নারী তার সম্পদের পূর্ণ মালিক এবং সে নিজের ইচ্ছানুযায়ী তা ব্যয় করতে পারে। তার সম্পদে অন্য কারও কোনো বাধ্যতামূলক অধিকার নেই; চাই সে পিতা-মাতা, স্বামী বা সন্তানই হোক না কেন, যতক্ষণ না সে নিজে স্বেচ্ছায় অনুমতি দেয়। উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় ইসলাম নারীদের অংশ নিশ্চিত করেছে, যা ইসলামপূর্ব যুগে কল্পনাতীত ছিল। 

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘পুরুষদের জন্য রয়েছে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদের অংশ, আর নারীদের জন্যও রয়েছে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদের অংশ তা কম হোক বা বেশি হোক, নির্ধারিত অংশ’ (সুরা নিসা : ৭)। এ ছাড়া বিয়ের সময় নারীরা মোহরানা প্রাপ্তির মাধ্যমে সম্পদের অধিকারী হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নারীদের সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর প্রদান করো; অতঃপর তারা যদি খুশি হয়ে তার কিছু অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা সানন্দে গ্রহণ করো’ (সুরা নিসা : ৪)। 

মোটকথা, ইসলাম ন্যায্যতা, ভারসাম্য ও ইনসাফের ধর্ম। ইসলাম নারীদের এমন এক মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নারীকে কখনো অবমূল্যায়ন নয়, বরং তার প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করাই ইসলামের শিক্ষা।


সময়ের আলো/কেএইচও
  বিষয়:   ইসলামে নারীর প্রকৃত মর্যাদা 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: