যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র সামনে এসেছে। বিভিন্ন অবকাঠামো, সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্রভাণ্ডারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ প্রায় অর্ধশত শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তির মৃত্যুর দাবি করা হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে দুই শতাধিক স্কুলশিক্ষার্থীর প্রাণহানি, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। শুরুতে দায় এড়িয়ে গেলেও পরে বৈশ্বিক চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র এই হামলাকে ‘ভুলবশত’ বলে স্বীকার করে।
তবে সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থেকেও কৌশলগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরান এই সংঘাতে তুলনামূলকভাবে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতিতে সাড়া না দিয়ে বরং হরমুজ প্রণালী অবরোধ করে তারা পাল্টা চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল যুদ্ধ ব্যয়। তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮৯০ মিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩৭.৮ মিলিয়ন ডলার এবং প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০ হাজার ৩০০ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ লাখ ৬৫ হাজার টাকার সমান।
স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) জানিয়েছে, এই ব্যয়ের বড় অংশই যাচ্ছে যুদ্ধাস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায়। দৈনিক প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ডলার—মোট ব্যয়ের প্রায় ৩৬ শতাংশ, খরচ হচ্ছে অস্ত্রশস্ত্রের পেছনে। বিমান অভিযানে প্রতিদিন প্রায় ২৪৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ২৭.৫ শতাংশ। নৌবাহিনীর কার্যক্রমে দৈনিক প্রায় ১৫৫ মিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে।
এছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়—যেমন থাড, প্যাট্রিয়ট ও এজিস—প্রতিদিন প্রায় ৯৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। গোয়েন্দা নজরদারি ও সাইবার কার্যক্রমে খরচ হচ্ছে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ডলার এবং জনবল, রসদ ও লজিস্টিক সহায়তায় আরও প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) জানিয়েছে, ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ অভিযানের প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। আর যুদ্ধের ৪১তম দিনে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬.৯৪ বিলিয়ন ডলারে।
তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, এই যুদ্ধ ব্যয়ের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অতীতের বড় সামরিক অভিযানের চেয়েও ব্যয়বহুল। ইরাক যুদ্ধে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৪১০ মিলিয়ন ডলার এবং আফগানিস্তান যুদ্ধে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হতো, সেখানে ইরানের ক্ষেত্রে এই ব্যয় প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে একে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ব্যয়বহুল মার্কিন সামরিক অভিযান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করা হলে ব্যাপক সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব হতো। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, এই অর্থ দিয়ে প্রায় ৪ লাখ ২৬ হাজার শিক্ষকের বার্ষিক বেতন দেওয়া যেত অথবা ২ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে কলেজ বৃত্তি দেওয়া সম্ভব হতো। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করলে প্রতি বছর হাজার হাজার হাসপাতালের শয্যা বৃদ্ধি, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্প স্থাপন কিংবা বিপুলসংখ্যক আবাসন নির্মাণ করা যেত।
সব মিলিয়ে, ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান এই সংঘাত শুধু সামরিক দিক থেকেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় এই বিপুল ব্যয়ের প্রভাব—যা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অবস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে।
/ইউএমএইচ