পেন গানে পেরেশান

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

সন্ত্রাসীদের অপ্রচলিত আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কপালে। এর উৎস সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত কিছু জানতে

2026-04-11T00:21:33+00:00
2026-04-11T00:21:33+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
পেন গানে পেরেশান
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:২১ এএম   (ভিজিট : ২৫)
পেন গান। ছবি : সংগৃহীত
সন্ত্রাসীদের অপ্রচলিত আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কপালে। এর উৎস সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত কিছু জানতে পারেননি গোয়েন্দারা। এ ধরনের অস্ত্রের উৎস সন্ধানে শুরু হয়েছে ব্যাপক অনুসন্ধান। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ভারত কিংবা পাকিস্তান থেকে এ ধরনের অস্ত্র আসতে পারে। আবার সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে গড়ে উঠা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর হাত ঘুরেও এ ধরনের অস্ত্র রাজধানীতে প্রবেশ করে থাকতে পারে বলে ধারণা গোয়েন্দাদের।

গত ৩ এপ্রিল পুরান ঢাকার নয়াবাজারে দিনের বেলায় এক গুলির ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে একটি ‘পেন গান’ উদ্ধার করে পুলিশ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) লালবাগ বিভাগের একটি দল যাত্রাবাড়ী ও কেরানীগঞ্জ থেকে সোহেল ওরফে কাল্লু এবং সাইমন নামে দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে এই বিশেষ অস্ত্রটি জব্দ করা হয়। গোয়েন্দারা এখন এর উৎস এবং চোরাচালান রুট খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, এটি ঢাকার অপরাধ জগতে নতুন উদ্বেগ যোগ করেছে। আকারে ছোট হওয়ায় এটি সহজে লুকিয়ে রাখা যায় এবং গুলি ছোড়ার আগে একে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত অস্ত্রটি একটি সিগারেটের প্যাকেটের ভেতরে লুকিয়ে রাখা ছিল। পুলিশ সন্দেহ করছে, এটি ভারত বা পাকিস্তান থেকে পাচার হয়ে আসতে পারে। গ্রেফতারকৃত এক আসামি জানিয়েছেন, অস্ত্রটি ৮০ হাজার টাকায় কেনা হয়েছিল এবং এটি বেশি দামে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল।
আরও পড়ুন

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার (দক্ষিণ) মো. নাসিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, এটি কোনো সাধারণ আগ্নেয়াস্ত্র নয়। এর আগে ঢাকায় এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের কোনো রেকর্ড নেই। এটি কীভাবে দেশে এলো, কারা এর কারিগর বা পাচারকারী এবং অন্য কোথাও এর ব্যবহার হয়েছে কি না তা বের করতে একাধিক টিম কাজ করছে।

পেন গান মূলত এমন একটি ছোট আগ্নেয়াস্ত্র, যা দেখতে সাধারণ কলমের মতো। সাধারণত দশমিক টু-টু বা দশমিক টু-ফাইভ ক্যালিবারের গুলি ছুড়তে সক্ষম এই অস্ত্র অধিকাংশ ক্ষেত্রে একবারে একটি গুলিই ছোড়ে। পুরোনো সংস্করণে পিনফায়ার পদ্ধতি ব্যবহৃত হলেও আধুনিক সংস্করণে রিমফায়ার বা সেন্টারফায়ার কার্টিজ ব্যবহৃত হয়।

এটি দেখতে অবিকল একটি স্টিলের কলমের মতো। ওপরে থাকে একটি পুশ বাটন এবং সামনে সুচালো নিব। একটি মোচড় দিয়ে বাটনে চাপ দিলেই বেরিয়ে আসে দশমিক টু-টু ক্যালিবারের বুলেট। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে পেন গান উদ্ধারের পর এ ধরনের অপ্রচলিত আরও কী অস্ত্র থাকতে পারে, সে বিষয়েও জোর তদন্ত চলছে।

ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশে পেন গান নতুন হলেও বিশ্বের অপরাধ জগতে এ ধরনের অপ্রচলিত বিভিন্ন অস্ত্রের ব্যবহার রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মুভিতে এসব অস্ত্রের ব্যবহার দেখানো হলেও বাস্তবেও এসব অস্ত্রের অস্তিত্ব রয়েছে, তবে ব্যবহার খুবই সীমিত। এসব অপ্রচলিত অস্ত্রের মধ্যে আছে বেল্ট বাকল পিস্তল (বেল্ট বাকল গান), যা বেল্টের বাকলের ভেতরে ছোট ক্যালিবারের পিস্তল হিসেবে লুকানো থাকে। আছে মোবাইল ফোন গান বা সেল ফোন গান, যা দেখতে অত্যন্ত আধুনিক স্মার্টফোনের মতো। এতে চারটি গুলি লোড করার চেম্বার থাকে। আছে ছাতা পিস্তল বা আমব্রেলা গান, যা ছাতার ফ্রেমের ভেতরে লুকানো বন্দুক, যা দিয়ে দূর থেকে গুলি বা বিষাক্ত ডার্ট ছোড়া যায়। দেশে পেন গানের অস্তিত্বের পর এরকম আরও কোনো অপ্রচলিত অস্ত্র আছে কি না তা গোয়েন্দা তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে অপ্রচলিত এ অস্ত্র উদ্ধারের পর বিভিন্ন মাধ্যমে এর উৎস সম্পর্কে সন্ধানে নামে গোয়েন্দারা। সন্দেহের তালিকায় থাকা চরমপন্থিদের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা যায়।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, গতানুগতিক অপরাধী বা সন্ত্রাসীদের কাছে এ ধরনের অপ্রচলিত অস্ত্রের প্রাপ্যতার লিংক থাকার আশঙ্কা খুবই কম। বিশেষায়িত বা অর্গানাইজড ক্রাইমের সঙ্গে যুক্ত কোনো দল বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে এ ধরনের বিশেষ অস্ত্র দেশের ভেতরে প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করছেন গোয়েন্দারা। সেই হিসেবে সীমান্ত সংলগ্ন সন্ত্রাসীগোষ্ঠী, সীমান্তকেন্দ্রিক অস্ত্র চোরাচালান চক্র, শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চরমপন্থিদের মতো সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলোকে কেন্দ্র করে চলছে তদন্ত কার্যক্রম।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চরমপন্থিদের ফের সশস্ত্র অবস্থায় ফিরে আসার খবরে তাদের দিকে সন্দেহ প্রবল। তাদের হাত ধরে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র রাজধানীতে প্রবেশ করছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থেকে বেশ কিছু অস্ত্রসহ দুজনকে গ্রেফতারের পর সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১২ অধিনায়ক আতিকুর রহমান মিয়া জানিয়েছিলেন, গ্রেফতারকৃতরা চট্টগ্রাম থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে ঢাকার আদাবরে নিয়ে রেখেছিল। পরে সুযোগমতো পাবনার চরমপন্থিদের কাছে পাঠায়।

ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে খুলনায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হাতে এমন অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, রাজধানীতে জব্দ করা অস্ত্রটিতে (পেন গান) কোনো কোম্পানির লোগো বা মার্কিং না থাকায় এর উৎস খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, শিগগিরই এর উৎসসহ বিস্তারিত তথ্য বের করা সম্ভব হবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, পেন গান উদ্ধারের পর এর প্রকৃত উৎস সম্পর্কে এখনও জানা সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলছে।

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের অপ্রচলিত অস্ত্রের বিষয়ে তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে এখন এসব বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন। সম্প্রতি ঢাকায় কলম আকৃতির একটি অস্ত্রের সন্ধান পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে তারা সচেতন হয়েছেন। এর উৎস ও ব্যবহারকারী কারা সে বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং সিআইডি কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের অস্ত্র স্থানীয়ভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়। বিশ্বের খুব বেশি জায়গায় এসব অস্ত্রের ব্যবহার নেই, সন্ত্রাসীরাই সাধারণত এসব অস্ত্র ব্যবহার করে।

এএডি/


  বিষয়:   পেন গান  পেন  গান  পিস্তল 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: