সপ্তাহের শেষভাগে এসে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দৃষ্টি এখন পাকিস্তানের দিকে। বৈশ্বিক এক সংকটপূর্ণ সময়ে দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিরতি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন।
শনিবারে (১১ এপ্রিল) শুরু হওয়া এই আলোচনা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বিশ্বের ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সফল করতে পাকিস্তান ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। রাজধানী ইসলামাবাদে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা, মোতায়েন করা হয়েছে ১০ হাজারের বেশি নিরাপত্তা সদস্য এবং শহরে প্রবেশের সব পথ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
পাকিস্তানের জন্য এটি কূটনৈতিক দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্টসহ উচ্চপর্যায়ের কোনো মার্কিন প্রতিনিধি পাকিস্তান সফর করেননি। সে দিক থেকে জেডি ভ্যান্সের সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পাকিস্তানের দ্বারস্থ হওয়া নতুন কিছু নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টরা বিভিন্ন কারণে পাকিস্তান সফর করেছেন। এবার দেখে নেওয়া যাক সেই ঘটনাগুলো।
আইসেনহাওয়ারের ঐতিহাসিক সফর
১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরের এক সকালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের আমন্ত্রণে করাচিতে আসেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইসেনহাওয়ার। এটিই ছিল কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম পাকিস্তান সফর।
দুই নেতা পূর্ব-পশ্চিম সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত প্রভাব, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক, সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন, পাকিস্তানের সামরিক প্রয়োজন এবং আফগানিস্তানসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
শিক্ষাবিদ পারভেজ হুদবয় স্মৃতিচারণ করে বলেন, সেই সফরের প্রস্তুতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শহরের ভবনগুলো সাজানো হয়েছিল, নতুন কার্পেট ও আলোকসজ্জায় সড়কগুলো বদলে গিয়েছিল, স্কুলগুলোতে চলছিল অভ্যর্থনার মহড়া। এমনকি একটি বিশাল ফোয়ারাও তৈরি করা হয়েছিল।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, করাচির এক দরিদ্র এলাকার দুর্গন্ধ ঢাকতে প্যারিস থেকে সুগন্ধি এনে রাস্তার পাশে ছিটানো হয়েছিল, যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অস্বস্তি বোধ না করেন।
এই সফরের পর যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে বাড়তি সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেয় এবং সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
এক অপ্রত্যাশিত বন্ধুত্ব
১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন পাকিস্তান সফরে গিয়ে করাচির যানজটে আটকে পড়েন। সেই সময় তিনি উটগাড়ির চালক বশির আহমেদকে দেখে গাড়ি থেকে নেমে তার সঙ্গে কথা বলেন।
এই আকস্মিক সাক্ষাৎ পরবর্তীতে বন্ধুত্বে রূপ নেয়। জনসন বশিরকে যুক্তরাষ্ট্রে আমন্ত্রণ জানান এবং তাদের সম্পর্ক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বজায় থাকে।
পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে জনসন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বল্প সময়ের জন্য আবার পাকিস্তান সফর করেন।
গোপন বার্তা পৌঁছানো
১৯৮৪ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ পাকিস্তানে গিয়ে সামরিক শাসক জিয়াউল হকের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের একটি চিঠি পৌঁছে দিতে সেখানে যান।
চিঠির বিষয়বস্তু প্রকাশ করা না হলেও ধারণা করা হয় এতে ভূরাজনীতি, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন যোগাযোগে পাকিস্তানের ভূমিকা
১৯৬৯ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পাকিস্তান সফর করেন এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেন।
দুই দেশের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে পাকিস্তান এই দায়িত্ব পায়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানের সহায়তায় গোপনে চীন সফর করেন, যা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।
ক্লিনটনের সংক্ষিপ্ত কিন্তু আলোচিত সফর
২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পাকিস্তান সফর করেন। তিনি মাত্র পাঁচ ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেন।
এই সফরে তিনি সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফের সঙ্গে ছবি তুলতে অস্বীকৃতি জানান, যাতে অভ্যুত্থানের প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত না যায়। এছাড়া তিনি প্রচলিত কূটনৈতিক রীতিও অনেকটা এড়িয়ে যান এবং সরাসরি টেলিভিশনে ভাষণ দেন।
চেনির অঘোষিত সফর
২০০৫ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি পাকিস্তান সফর করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের কথা বলেন। ২০০৭ সালে তিনি আবারও একটি গোপন সফরে পাকিস্তানে যান।
ধারণা করা হয়, সে সময় তিনি আল-কায়েদার বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পাকিস্তানকে চাপ দেন।
বুশের সফর ও কড়া নিরাপত্তা
২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ গভীর রাতে পাকিস্তানে পৌঁছান। নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, এমনকি বিভ্রান্তি তৈরির জন্য একাধিক হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়।
ইসলামাবাদে লকডাউন জারি করা হয় এবং হাজারো নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়। বৈঠকে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও ভূমিকম্প সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়।
বাইডেনের দ্বৈত বার্তা
২০০৯ ও ২০১১ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেন পাকিস্তান সফর করেন।
প্রথম সফরে তিনি পাকিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে উল্লেখ করেন এবং সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। সে সময় তাকে হিলাল-ই-পাকিস্তান পদক দেওয়া হয়।
তবে দ্বিতীয় সফরে তার অবস্থান ছিল ভিন্ন—তিনি একদিকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন, অন্যদিকে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিতও দেন।
এইভাবে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত ও কূটনৈতিক প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে এবং দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
/ইউএমএইচ