সময়ের আলো : নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশনকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এ যথেষ্ট বলে আপনি মনে করেন?
আব্দুস সালাম : যথেষ্ট না। সিটি করপোরেশনকে সিটি গভর্নমেন্টে রূপান্তরিত করতে হবে। সার্ভিস অরিয়েন্টেড যেসব অরগানাইজেশন আছে সেগুলো সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তা না হলে নাগরিক সুযোগ-সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা যাবে না। অটোরিকশার ব্যাপারে সবাই বলছে, কিন্তু এটার লাইসেন্স দেওয়ার অধিকার সিটি করপোরেশনের নেই। এটাকে আমি বন্ধ কীভাবে করব? একদিক দিয়ে সিটি করপোরেশন রাস্তা করে আরেক দিক দিয়ে রাজউক বা ওয়াসা এসে সেগুলো কাটে। মেট্রো পুলিশসহ সবকিছুই নগর সরকারের মধ্যে আসতে হবে। সবকিছু মেয়রের নিয়ন্ত্রণে আসতে হবে, তবেই নাগরিক সেবাগুলো নিশ্চিত এবং আরও উন্নত করা সম্ভব। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টি কীভাবে সমন্বয় করা যায় সেই চেষ্টা করছেন।
সিটি গভর্নমেন্টের বিষয়ে তা হলে পরিকল্পনা কী?
আব্দুস সালাম : প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে অবগত। সরকার এটা নিয়ে কাজ করছে। জনগণের জন্য যা ভালো হয়, তাই করা হবে।
ঢাকা শহরে মশার উপদ্রব বেড়েছে, সিটি করপোরেশন বারবার এটা নিরাময়ের চেষ্টা করেও ব্যর্থ মনে করেন কি না?
আমি এটিকে সরাসরি ব্যর্থতা হিসেবে দেখি না। কারণ বাস্তবতা হলো পৃথিবীর কোনো শহরেই মশা সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। পরিবেশবিদরাও পরিষ্কারভাবে বলেন, মশাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় কিন্তু একেবারে নির্মূল করা যায় না।
ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে খাল-নালা ভরাট হয়ে গেছে, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে, ড্রেনেজ সিস্টেম অকার্যকর হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেনেজ বন্ধ হয়ে আছে। এসব জায়গা এখন মশার প্রজননের প্রধান কেন্দ্র।
এ সমস্যাগুলো এক-দুই মাসে সমাধান করার মতো নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি অব্যবস্থাপনার ফল। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আমরা দ্রুত একটি এক মাসের ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ হাতে নিয়েছি। এর আওতায় প্রতিটি ওয়ার্ডে মশা নিধন, ড্রেন পরিষ্কার, আবর্জনা অপসারণ এবং সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
আমরা জনগণকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছি। মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করা হচ্ছে। কারণ জনগণ সচেতন না হলে শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এখানে আমি মনে করি জনগণের ৫০ শতাংশ দায়িত্ব এবং সিটি করপোরেশন ৫০ শতাংশ। যৌথভাবে যদি ১০০ শতাংশ দায়িত্ব পালন করি তা হলে ঢাকা সিটিটা বসবাসযোগ্য হবে, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং সেই লক্ষ্যে আমরা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কাজ করে যাচ্ছি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কি সুশাসন নিশ্চিত করতে পারবে?
আব্দুস সালাম : শতভাগ নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। তবে আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি। দায়িত্ব নেওয়ার পরই আমরা জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে প্রায় ১০টি ওয়ার্ডে মশার উৎপাদন বেশি। আমরা সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছি। পাশাপাশি মাঝারি ঝুঁকির এলাকাগুলোতেও নজর দেওয়া হচ্ছে।
আমরা আমাদের কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রীর কাছেও উপস্থাপন করেছি। তিনি দ্রুত কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে বলেছেন।
আমাদের লক্ষ্য হলো একটি জবাবদিহিমূলক, কার্যকর এবং নাগরিকবান্ধব সিটি করপোরেশন গড়ে তোলা। এটি সময়সাপেক্ষ হলেও আমরা ধাপে ধাপে এগোচ্ছি।
বিগত সরকারের সময় সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে সব সেবা নিয়ে নাগরিকদের বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে...
নাগরিকদের যেরকম অভিযোগ, এটা আমারও অভিযোগ, এটাকে দূর করতেই হবে। বাস্তব চিত্র হচ্ছে, প্রতি মাসে সিটি করপোরেশনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২৫ কোটি টাকার মতো বেতন লাগে। এর বাইরে ঈদ বোনাস রয়েছে। সেটার জন্য আমার অন্যখান থেকে লোন করতে হয়েছে। এ মাসেও একই অবস্থা। রেভিনিউ ইনকাম একেবারেই অর্ধেকে চলে এসেছে। লাস্ট যারা ছিল সেখানে তাদের ব্যর্থতা ছিল। রেভিনিউ কীভাবে আরও কার্যকর করা যায় সেটা নিয়ে কাজ করছি। নতুন যুক্ত হওয়া ১৮টি ওয়ার্ডকে এখন পর্যন্ত আমরা সেভাবে ট্যাক্সের আওতায় আনতে পারিনি। আমরা চেষ্টা করছি নাগরিকদের সঙ্গে আলোচনা করতে। আমরা চেষ্টা করছি ট্রেড লাইসেন্সগুলো আরও কীভাবে ইজি করা যায়। কারণ রেভিনিউ ইনকাম বাড়াতে হলে ইনকাম সোর্সগুলোকে তো আমাদের ইফেক্টিভলি ওয়ার্ক করাতে হবে। চলতি সপ্তাহে রেভিনিউ সেকশনের সঙ্গে আমাদের বৈঠক আছে, সেখানে একটা রেজাল্ট আসবে।
তা হলে কি ট্যাক্স বাড়বে?
আব্দুস সালাম : না, ট্যাক্স বাড়ার কোনো সিদ্ধান্ত নেই এ মুহূর্তে। ট্যাক্স যা আছে সেটাই যাতে আদায় করা যায় সে জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ঠিকাদারদের একটি চক্র সবসময় সিটি করপোরেশনে প্রভাব বিস্তার করে, এই সিন্ডিকেটকে ভাঙার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন কি না?
আব্দুস সালাম : আগের সরকার প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কাজ অগ্রিম দিয়ে গেছে। এই কাজগুলো আদৌ প্রয়োজনীয় ছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
আমি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছি প্রতিটি প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, বাস্তবতা ও অগ্রাধিকার যাচাই করতে। রিপোর্ট পাওয়ার পর আমরা সিদ্ধান্ত নেব।
আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই এখানে কোনো সিন্ডিকেট চলবে না। নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। কেউ যদি অনিয়ম করার চেষ্টা করে, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিটি করপোরেশনে বিএনপি সরকারের প্রশাসক নিয়োগের ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই সমালোচনা করছে...
এখন বিএনপি সরকারে এসেছে, এখানে কি জামায়াতের প্রশাসক হবে নাকি? বিএনপির একটা ইলেকশন ম্যানিফেস্টো আছে, সে অনুযায়ী আমরা কাজ করতে চাই। বিএনপির ঘোষিত ম্যানিফেস্টো কি অন্য কেউ বাস্তবায়ন করবে? সেটা তো বিএনপিকেই করতে হবে। এখন মানুষ যদি নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় তা হলে তো দায়টা আসবে নির্বাচিত সরকারের ওপর। সরকারও চুপ করে বসে থাকতে পারে না। তাই মানুষকে সেবা দিতেই প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে।
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
আব্দুস সালাম : আপনাকেও ধন্যবাদ।