প্রতিদিন সকালেই পাথরের কাজে জড়িয়ে পড়েন হাজার হাজার পাথর শ্রমিক। দিনভর ধুলোবালি আর ক্র্যাশিং মেশিনে পাথর ভাঙার কাজ করেন তারা। পাথর ভাঙা মেশিনের মুহুর্মুহু শব্দ আর হাজারো শ্রমিকের কর্মব্যস্ততা চলে দিনভর। জীবিকার তাগিদে জড়িয়ে পড়া এ পেশায় পাথর শ্রমিক হিসেবেই পরিচিত তারা। দিনভর হাড়ভাঙা পরিশ্রমেই চলে তাদের সংসার। পরিবার-পরিজনের মৌলিক চাহিদা। কাজ করলে আয় হয়, না হলে দিন কাটে অর্থকষ্টে।
সেই জীবিকার জায়গায় চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে থমকে গেছে পঞ্চগড়ে গড়ে ওঠা পাথর শিল্প। তীব্র জ্বালানি সংকটে বন্ধ ডিজেলচালিত ক্রাসিং মেশিনগুলো। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কয়েক হাজার শ্রমিকের জীবন-জীবিকার ওপর। কাজ করতে না পেরে দিশাহারা অনেক শ্রমিক। যাদের দিনমজুরিতে চলে সংসার, তারা পড়েছেন চরম বিপাকে।
স্থানীয় পাথর শ্রমিক, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় মহানন্দা, করতোয়া, ডাহুকসহ অন্য নদ-নদী থেকে উত্তোলিত পাথর আর বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে ভারত ও ভুটান থেকে আমদানিকৃত পাথর ভাঙার ওপর এ অঞ্চলের অর্থনীতি অনেকাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু চলমান ডিজেল সংকটে পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না প্রয়োজনীয় তেল। যেখানে একটি মেশিনে প্রতিদিন অন্তত ১৮-২০ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন, সেখানে পাম্প থেকে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৫ লিটার। ফলে বাধ্য হয়ে ৩ দিনের তেল জমিয়ে ১ দিন মেশিন চালাতে হচ্ছে মালিকদের। এতে করে সপ্তাহের অধিকাংশ সময়ই অলস বসে থাকতে হচ্ছে শ্রমিকদের।
গত কয়েক দিন ধরে ডিজেল তেল পেতে ফুয়েল কার্ডের জন্য ছুটোছুটি করতে দেখা গেছে পাথরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। পাম্পে পাম্পে ঘুরতে ঘুরতে সময়মতো প্রয়োজনীয় তেল না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। যার কারণে পাথর ভাঙা ক্র্যাশিং মেশিন চালাতে পারছেন না। এতে করে শ্রমিকদেরও পড়তে হচ্ছে বিপাকে। কাজে আসলে কাজ করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন দিন আনা এসব শ্রমিক।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের পাথর সাইটের পাথর শ্রমিক জিয়ারুল ও আমিরুল জানান, ‘তেল না থাকায় মেশিন চলে না। তিন দিন তেল জমিয়ে এক দিন কাজ করি। এভাবে চললে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। আয়মনা বেগম ও ফিরোজা আক্তার নামে দুই নারী পাথর শ্রমিক জানান, জেলার বাইরে থেকে এসে পাথরের কাজ করছেন তারা। কেউ স্বামীসহ পাথর ভাঙার কাজ করে সংসার চালান। কিন্তু মেশিন বন্ধ থাকায় এখন সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে।
পাথর শ্রমিক জাবেদুল ইসলাম বলেন, মেশিন না চলায় মহাজন আমাদের টাকা দিতে পারছেন না। নদী থেকে পাথর তুলেও লাভ হচ্ছে না, কারণ তা পরিবহন বা ক্রাসিং করা যাচ্ছে না।
এদিকে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় পরিবহন খাতেও। নদী থেকে পাথর সাইটে নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত ট্রাক্টর তেলের অভাবে বন্ধ হয়ে আছে। ট্রাক্টরচালক আজিমুদ্দিন জানান, সারা দিন পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়েও ৫-৭ লিটারের বেশি তেল মিলছে না, যা দিয়ে কাজ চালানো অসম্ভব। ফলে পরিবহন শ্রমিকরাও এখন কর্মহীন।
আমদানি-রফতানিকারক আহসান হাবীব জানান, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের পাথরের সাইটে দুটি ক্র্যাশিং মেশিন বন্ধ রয়েছে। এ দুটি মেশিনে অনেক শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু বেশ কয়েক দিন ধরে জ্বালানি তেলের অভাবে মেশিন চালাতে পারছি না। আমার মতো অনেক ব্যবসায়ীর একই অবস্থা। তেলের সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে এই শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।
এই সংকটের বিষয়ে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লিমিটেডের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে স্থানীয় পাথর ক্রাসিং শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বন্দরের মূল আমদানি-রফতানি কার্যক্রম এখনও স্বাভাবিক রয়েছে। ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে পাথরের পাশাপাশি গম ও আখের মোলাসেস আমদানি হচ্ছে। এ ছাড়া দেশ থেকে খাদ্যপণ্য, ইলেকট্রনিক্স ও পাটজাত পণ্য রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করে জানান, জ্বালানি সমস্যার সমাধান হলে এই স্থলবন্দর আরও সক্রিয় হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
পাথরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশালসংখ্যক শ্রমিক গোষ্ঠীকে বাঁচাতে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে দ্রুত জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। নতুবা কয়েক হাজার পরিবার স্থায়ীভাবে সংকটে পড়বে এমনই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।