সুরের মায়াজালে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী আশা ভোঁসলে। কখনো চঞ্চলতা, কখনো বিরহ, আবার কখনো গভীর ক্ল্যাসিক্যাল- সব ধারাতেই তিনি ছিলেন সমান সিদ্ধহস্ত। ‘মোহ’ শব্দটিকে যেন তিনি রক্তমাংসের বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন তার কণ্ঠে। কিন্তু সেই কিন্নরকণ্ঠী শিল্পী না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন গতকাল।
১৯৩৩ সালে ভারতের তৎকালীন দেশীয় রাজ্য সাঙ্গলীর এক জনপদে জন্মগ্রহণ করেন আশা ভোঁসলে, যা পরে মহারাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। তার বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী এবং মা শেবন্তী দীননাথ। মাত্র ৯ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর পরিবারটি বিভিন্ন শহর ঘুরে এসে স্থায়ী হয় তৎকালীন বোম্বাইয়ে।
তখন থেকেই সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে আশা ভোঁসলে ও তার প্রতিভাবান বোন, আরেক কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকরের ওপর।
১৯৪৩ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে মারাঠি চলচ্চিত্র ‘মাঝা বল’-এ প্রথম প্লেব্যাক করেন আশা ভোঁসলে। এরপর ১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে হিন্দি সিনেমায় প্লেব্যাক শুরু করেন। প্রথমদিকে তিনি মূলত দ্বৈতকণ্ঠে গান গাইতেন। তবে ১৯৪৯ সালে ‘রাত কি রানি’ চলচ্চিত্রে এককভাবে গান গাওয়ার সুযোগ পান।
পঞ্চাশের দশকে যখন শামসাদ বেগম সংগীত জগতে শীর্ষে, তখনই উদীয়মান শিল্পী হিসেবে আবির্ভূত হন দুই বোন লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলে। ১৯৫২ সালে ও.পি. নাইয়ারের সুরে ‘ছম ছমছম’ গানটি তার ক্যারিয়ারে বড় মোড় এনে দেয়। এরপর ‘পরিণীতা’ (১৯৫৩) ও ‘বুট পলিশ’ (১৯৫৪) চলচ্চিত্রের গান তাকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়।
ষাটের দশকে একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দিতে থাকেন তিনি। মোহাম্মদ রফি ও কিশোর কুমারের সঙ্গে অসংখ্য দ্বৈত গানে সৃষ্টি হয় অনন্য রসায়ন। তার কণ্ঠের বৈচিত্র্য ও কুহক সংগীত পরিচালকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। পরবর্তী সময়ে শচিন দেব বর্মণের নজরে আসেন আশা ভোঁসলে, যা তার ক্যারিয়ারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
১৯৬৬ সালের পর থেকে রাহুল দেব বর্মণের সুরে একের পর এক কালজয়ী গান উপহার দেন তিনি। ‘ও মেরে সোনা রে’, ‘ও হাসিনা জুলফোঁওয়ালি’, ‘আজা আজা ম্যায় হুঁ প্যায়ার তেরা’- এসব গান আজও মানুষের মুখে মুখে।
রাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে তার জুটি শুধু সংগীতেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও গড়ে ওঠে। সুরের নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনি সবসময় সাড়া দিতেন। ১৯৭১ সালের ‘ক্যারাভান’ চলচ্চিত্রের ‘পিয়া তু আব তো আজা’ এবং ‘দম মারো দম’ গান তাকে ভিন্ন এক উচ্চতায় নিয়ে যায়।
বিশেষ করে ‘দম মারো দম’ গানটিতে তিনি হিপি সংস্কৃতির আবহ তুলে ধরেন, যা আজও জনপ্রিয় এবং নিয়মিত রিমিক্স হয়। বাপ্পি লাহিড়ীর সুরেও তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় গান গেয়েছেন, যার মধ্যে ‘নমক হালাল’ উল্লেখযোগ্য।
নিজের কণ্ঠ নিয়ে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন আশা ভোঁসলে। ‘উমরাও জান’ চলচ্চিত্রে খৈয়ামের সুরে ‘ইন আঁখোঁ কি মস্তি’ ও ‘দিল চিজ কি হ্যায়’ গান তার গায়কি-দক্ষতার অনন্য উদাহরণ। গজল গায়নেও তিনি ছিলেন পারদর্শী। পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, আশাজীর মতো স্বরপ্রক্ষেপণের শক্তি সংগীত জগতে বিরল।
শুধু হিন্দি নয়, বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষাতেও সমান পারদর্শিতার সঙ্গে গান গেয়েছেন তিনি। বাংলাতেও রাহুল দেব বর্মণ, সলিল চৌধুরী ও সুধীন দাশগুপ্তের সুরে অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন। ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’, ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও’- এমন গান আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে দোলা দেয়। রবীন্দ্রসংগীতেও তার কণ্ঠ সমানভাবে সমাদৃত হয়েছে।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অর্জন করেছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। পেয়েছেন গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন, ২০০০ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে পদ্মবিভূষণ। ২০১১ সালে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে সর্বাধিকসংখ্যক স্টুডিও রেকর্ডিং করা শিল্পী হিসেবে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।
ব্যক্তিগত জীবনে আশা ভোঁসলে প্রথম বিয়ে করেন গণপতিরাও ভোঁসলেকে, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। ১৯৬০ সালে সেই বিয়ে ভেঙে যায়। পরে ১৯৮০ সালে গায়ক রাহুল দেব বর্মণকে বিয়ে করেন। ১৯৯৪ সালে তার দ্বিতীয় স্বামী মারা যান।
প্রায় ১৮টি ভাষায় ১৫ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন আশা ভোঁসলে। বলিউডেই তিনি এক হাজারের বেশি চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন- যা একক কোনো শিল্পীর জন্য বিরল অর্জন।
উপমহাদেশের এই কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী গতকাল রোববার মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। তার ছেলে আনন্দ ভোঁসলে মায়ের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমার মা আর নেই।’
সময়ের আলো/কেএইচও