গ্রীষ্মকাল এলেই আমার চেম্বারে রোগীর ভিড় বেড়ে যায়। বিশেষ করে এপ্রিল থেকে জুন, এই সময়টায় প্রতিদিনই কয়েকজন করে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী দেখতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এই সমস্যাটি প্রতিরোধযোগ্য, কিন্তু সচেতনতার অভাবে তা ভয়াবহ রূপ নেয়।
হিট স্ট্রোক মূলত শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যর্থতার ফল। আমাদের শরীর স্বাভাবিকভাবে ঘাম ঝরিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু যখন পরিবেশের তাপমাত্রা খুব বেশি হয়ে যায় এবং শরীর সেই তাপ সহ্য করতে পারে না, তখন শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে গিয়ে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তারও বেশি হতে পারে। এই অবস্থাকেই আমরা হিট স্ট্রোক বলি, যা একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি।
আমার চেম্বারে আসা রোগীদের মধ্যে বেশিরভাগই দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক কিংবা খোলা জায়গায় কাজ করেন এমন মানুষ। এক দিন দুপুরে একজন মধ্যবয়সি শ্রমিককে আনা হলো, তিনি কাজ করতে করতে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। তার শরীর জ্বলছিল, ঘাম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি সাড়া দিচ্ছিলেন না। দ্রুত ঠান্ডা করার ব্যবস্থা ও জরুরি চিকিৎসা না দিলে তার জীবন বিপন্ন হয়ে যেত। হিট স্ট্রোক কতটা মারাত্মক হতে পারে তা এই রোগীকে না দেখলে বোঝা যেত না।
হিট স্ট্রোকের লক্ষণগুলো সাধারণত হঠাৎ করেই প্রকাশ পায়। উচ্চ জ্বর, মাথা ঘোরা, তীব্র দুর্বলতা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, ত্বক শুকিয়ে যাওয়া, দ্রুত হার্টবিট এবং অনেক ক্ষেত্রে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, এসবই এর প্রধান লক্ষণ। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে খিঁচুনিও দেখা যায়। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, অনেক সময় রোগী বুঝতেই পারেন না যে তিনি হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন।
শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। ছোট শিশুদের শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে, আর বয়স্কদের শরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে দুর্বল হয়ে যায়। আমি প্রায়ই দেখি, বয়স্ক রোগীরা দুপুরের প্রচণ্ড রোদে বাইরে বের হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি থাকে। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, স্থুলকায় ব্যক্তি, যারা দিনের বেলায় প্রচণ্ড রোদে শারীরিক পরিশ্রম করে। যেমন- কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, যারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ও যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কম বেশি হয়ে থাকে।
হিট স্ট্রোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। হিট স্ট্রোকের সন্দেহ হলে প্রথমেই রোগীকে ছায়াযুক্ত ঠান্ডা জায়গায় নিতে হবে। তার শরীরের কাপড় ঢিলা করে দিতে হবে এবং ঠান্ডা পানি দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে। সম্ভব হলে ফ্যান বা এসির বাতাসে রাখতে হবে। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি, কারণ দেরি হলে মস্তিষ্ক, কিডনি বা হৃদযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই এখানে সবচেয়ে কার্যকর। গরমের সময় কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললেই হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। যেমন:-
*দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত রোদে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলা।
*পর্যাপ্ত পানি পান করা, হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা।
*বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ছাতা বা ক্যাপ, সানগ্লাস ও খাবার পানি সঙ্গে রাখা। অনেকেই পানি পানের গুরুত্বকে অবহেলা করেন, কিন্তু শরীরকে ঠান্ডা রাখতে এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
*তীব্র গরম থেকে দূরে থাকা, যতবেশি সম্ভব ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়া।
*পানিবাহিত রোগ থেকে বাঁচার জন্য রাস্তায় তৈরি পানীয় ও খাবার এড়িয়ে চলা।
*গরমে ঘামের সঙ্গে পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। তাই পানির সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার স্যালাইন, ফলের রস পান করতে হবে।
*প্রয়োজনে একাধিকবার ঠান্ডা পানিতে গোসল করা।
*শিশুদের ও বয়স্কদের বাসা থেকে কম বের করা।
*বাসার পরিবেশ গরম যাতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা। সম্ভব হলে ফ্যান, এয়ার কুলার, এসি ব্যবস্থা করা।
*প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হওয়া। জানালার পর্দা টেনে দেয়া।
*অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের কাজ এড়িয়ে চলা, সম্ভব না হলে ঘনঘন বিরতি নেওয়া এবং বিশ্রামের জন্য শীতল জায়গা খোঁজা।
*পানিশূন্য করতে সাহায্য করে এমন পানীয় পরিহার করা যেমন- চা, কফি, অ্যালকোহল।
*বাইরে গেলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা।
*দিনের বেলায় ব্যায়াম পরিহার করা। একান্তই প্রয়োজন পড়লে ঠান্ডা পানিতে সাঁতার কাটা। যদি কেউ নিয়মিত ব্যায়াম করে তা ভোর ৪টা থেকে ৬টার মধ্যে সম্পূর্ণ করা।
*প্রস্রাবের রং হলুদ হলে পানি খাওয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া।
*অসুস্থবোধ হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।
আমি আমার রোগীদের সবসময় বলি, ‘তৃষ্ণা লাগার আগেই পানি পান করুন।’ কারণ তৃষ্ণা লাগা মানেই শরীর ইতিমধ্যে পানিশূন্য হতে শুরু করেছে। এ ছাড়া লবণ-চিনি মিশ্রিত পানীয় বা ওরস্যালাইন পান করাও উপকারী, বিশেষ করে যারা বাইরে কাজ করেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- গাড়ির ভেতরে শিশু বা বয়স্ক কাউকে রেখে যাওয়া। অনেক সময় আমরা ভুলে যাই, বন্ধ গাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা খুব দ্রুত বেড়ে যায়, যা কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাণঘাতী হতে পারে।
একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি বলব, স্ট্রোককে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এটি শুধু একটি অসুস্থতা নয়, বরং অবহেলা করলে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই নিজে সচেতন হোন, পরিবারকে সচেতন করুন এবং আশপাশের মানুষদেরও সতর্ক করুন।
গরমকে অবহেলা করবেন না। একটু সতর্কতা, একটু সচেতনতা- এই দুটিই আপনাকে ও আপনার পরিবারকে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখতে পারে।
লেখক : মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
সময়ের আলো/জেডআই