হলস্ট্যাটকে কেন বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

আল্পস পর্বতমালার বিশালতায় ঘেরা অস্ট্রিয়া। দেশটির অর্ধেকের বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে এই আকাশচুম্বী পাহাড় শ্রেণি। এরই মাঝে দক্ষিণ থেকে পূর্বে

2026-04-18T20:07:09+00:00
2026-04-18T21:30:01+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ফিচার
হলস্ট্যাটকে কেন বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:০৭ পিএম  আপডেট: ১৮.০৪.২০২৬ ৯:৩০ পিএম
হলস্ট্যাট। ছবি : সংগৃহীত
আল্পস পর্বতমালার বিশালতায় ঘেরা অস্ট্রিয়া। দেশটির অর্ধেকের বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে এই আকাশচুম্বী পাহাড় শ্রেণি। এরই মাঝে দক্ষিণ থেকে পূর্বে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার পথ ধরে ধীরলয়ে বয়ে চলেছে ঐতিহাসিক দানিউব নদী। অস্ট্রিয়ার উত্তর ভাগে সালসকামার্গাট লেক জেলার পাহাড়ের ভাঁজে লুকিয়ে আছে এমন এক জনপদ, যাকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে মানুষের বিস্ময়ের শেষ নেই। নাম তার হলস্ট্যাট।


​চলুন, শব্দের বুননে গড়া এক দীর্ঘ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। এমন এক গ্রামে, যেখানে সময় থমকে দাঁড়িয়েছে ৩,৫০০ বছরের পুরনো এক সভ্যতাকে পাহারা দিতে।

​রূপকথার শুরু: হ্রদের আয়নায় এক স্বর্গরাজ্য

​হলস্ট্যাটে যাওয়ার পথটা নিজেই একটা পূর্ণাঙ্গ গল্প। যখন আপনি ট্রেনে করে আত্তনাং-পুখেইম হয়ে হ্রদের পূর্ব তীরের স্টেশনে নামবেন, আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে ৯ বর্গ কিলোমিটারের এক বিশাল শান্ত হ্রদ, যার নাম হলস্ট্যাটারসি। এই লেকের অপর পাড়ে পাহাড়ের গায়ে গায়ে ধাপ কেটে বসানো পুতুলের মতো বাড়িগুলোই হলো হলস্ট্যাট।


​স্টেশন থেকে ছোট্ট একটি বোট যখন হ্রদের বুক চিরে গ্রামের দিকে এগোতে থাকে, তখন দুপাশের বিশাল পাহাড়গুলোকে মনে হবে হ্রদের চিরকালীন শক্তিশালী অভিভাবক। জলরাশির ওপর দিয়ে ভেসে যাওয়ার সময় আপনার মনে হবে আপনি কোনো সিনেমার ট্রেলারে ঢুকে পড়েছেন। বোটটি যখন ঘাটে ভেড়ে, তখন আপনাকে স্বাগত জানাবে 'বারোক' স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি শতাব্দী প্রাচীন সব বাড়ি। প্রতিটি কাঠের বাড়ির বারান্দায় ঝুলছে রঙিন অর্কিড আর মরশুমি ফুলের সমারোহ। গ্রীষ্মে যখন পাহাড়ের বরফ গলে চারপাশ সবুজ হয়ে ওঠে, তখন হলস্ট্যাটকে মনে হয় ‘হিমবাহের বাগান শহর’। আর শীতে? যখন তুষারের চাদরে ঢেকে যায় গির্জার সাদা চূড়া আর ছোট ক্যাফেগুলোর ছাদ, তখন মনে হবে আপনি পৃথিবীর বাইরের কোনো মায়াপুরে পা রেখেছেন।

​ইতিহাসের গহীনে: লবণের ঐশ্বর্য ও হলস্ট্যাট সংস্কৃতি

​হলস্ট্যাট শুধু সুন্দরের আধার নয়, এটি মানব সভ্যতার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বাঁক। ১৮৪৬ থেকে ১৮৯৯ সাল পর্যন্ত একদল প্রত্নতাত্ত্বিক এখানে নিবিড় খনন কাজ চালিয়েছিলেন। সেই খনন থেকে যা বেরিয়ে এসেছিল, তা সারা বিশ্বের ইতিহাসবিদদের চমকে দিয়েছিল। জানা যায়, আল্পসের এই দুর্গম অঞ্চলেই ব্রোঞ্জ যুগের সমাপ্তি ঘটেছিল এবং লৌহ যুগের সূচনা হয়েছিল। আজ ইতিহাস বইতে আমরা যে ‘হলস্ট্যাট সংস্কৃতি’র কথা পড়ি, তার আদি উৎস এই পাহাড়ী গ্রামটিই।


​এই সভ্যতার প্রাণভোমরা ছিল এক প্রাগৈতিহাসিক প্রাকৃতিক লবণ খনি, যা বিশ্বের প্রথম এবং প্রাচীনতম লবণ খনি হিসেবে স্বীকৃত। হাজার হাজার বছর আগে, যখন লবণ ছিল বর্তমানের সোনার মতো মূল্যবান সম্পদ, তখন এই খনিকে কেন্দ্র করেই এই জনপদ গড়ে উঠেছিল। লবণের সেই ব্যবসার টানেই পাহাড়ের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে আদি মানুষেরা বসতি স্থাপন করেছিল। লবণের একটি অদ্ভুত প্রাকৃতিক গুণ আছে-এটি জৈব বস্তুর পচন রোধ করে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা লবণের খনির পাশেই প্রায় ২,০০০ মানুষের এক বিশাল সমাধিক্ষেত্র খুঁজে পেয়েছেন। অবাক করা বিষয় হলো, খনির ভেতরে লবণের আবহে কয়েক হাজার বছর ধরে শুয়ে থাকা শ্রমিকদের দেহাবশেষ এবং তাদের পরিহিত পশমের পোশাকগুলো প্রায় নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত ছিল। এই সমাধিগুলোকে ঐতিহাসিকরা খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ থেকে ৪৫০ সাল পর্যন্ত দুটি ভিন্ন স্তরে ভাগ করেছেন।

​অলিতে-গলিতে হারানো

​হলস্ট্যাটের সরু আঁকাবাঁকা গলি দিয়ে যখন আপনি পাহাড়ের ওপরের দিকে হাঁটতে শুরু করবেন, আপনার মনে হবে আপনি কোনো টাইম মেশিনে করে কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে গেছেন। রাস্তার ধারের বাড়িগুলো শত শত বছরের পুরনো, অথচ সেগুলোর প্রতিটি জানালা, প্রতিটি দেয়াল বাসিন্দাদের পরম যত্নে তকতকে আর সুসজ্জিত। প্রতিটি মোড়ে কোনো না কোনো ক্যাফে বা ছোট হোম-স্টে আপনার চোখে পড়বে, যেখান থেকে ভেসে আসা কফির ঘ্রাণ আপনাকে মুহূর্তেই সতেজ করে দেবে।


​পাহাড়ের যত উঁচুতে আপনি উঠবেন, হ্রদের দৃশ্য ততটাই মোহনীয় হয়ে ধরা দেবে। পাহাড়ের ধাপগুলো যেন সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে উঠে গেছে মেঘের দিকে। এখানকার বাসিন্দাদের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি অসাধারণ। সামান্য একটি ছোট গলিকেও তারা নানা রঙের ফুল আর শিল্পকর্ম দিয়ে সাজিয়ে রাখেন। এখানকার বাড়িগুলো মূলত কাঠের ওপর নির্ভর করে তৈরি, যাকে বলা হয় 'টিম্বার-ফ্রেমিং' শৈলী।

​বিস্ময়ের নাম ডাশ্চটেইন ও বরফ গুহা

​হলস্ট্যাট গ্রাম ছাড়িয়ে একটু দূরেই পর্যটকদের জন্য অপেক্ষা করছে আরও রোমাঞ্চ। এখানকার ‘কালচারাল হেরিটেজ মিউজিয়াম’ এবং ‘দ্য বেইনহাউস’ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে আসল রোমাঞ্চ লুকিয়ে আছে ভূগর্ভে। এখানে রয়েছে বিখ্যাত ‘ম্যামথ কেভ’। ইউরোপের অন্যতম সুন্দর এই গুহাটি প্রায় ১,১৭৪ মিটার গভীর।


​এছাড়াও রয়েছে ডাশ্চটেইন বরফ গুহা। যেখানে পাহাড়ের গভীরে জমে যাওয়া জলপ্রপাত আর বিশালাকার বরফের স্তূপ আপনাকে অন্য এক গ্রহে নিয়ে যাওয়ার অনুভূতি দেবে। আপনি চাইলে হ্রদের শান্ত জলে বোটিং করতে পারেন কিংবা পাহাড়ের পাকদণ্ডী পথে ট্রেকিং করে ওপর থেকে পুরো গ্রামের দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। একেকটি বাঁক যেন একেকটি ফ্রেমবন্দি করার মতো ছবি।

চীনাদের নকল ও আসল হলস্ট্যাট

​হলস্ট্যাটের সৌন্দর্য এতটাই ঈর্ষণীয় যে, ২০১২ সালে চিনের গোয়াংডং প্রদেশে প্রায় ৯৪০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে এই গ্রামের একটি অবিকল নকল সংস্করণ তৈরি করেছে মিনমেটালস নামে এক নির্মাণ সংস্থা। গির্জা থেকে শুরু করে চত্বরের প্রতিটি ছোট পাথর-সবই হুবহু নকল করার চেষ্টা করেছে চীনারা। মজার ব্যাপার হলো, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চলেছে আসল হলস্ট্যাটের বাসিন্দা বা প্রশাসনকে কিছু না জানিয়েই।

​খবর পেয়ে হলস্ট্যাটের মেয়র যখন চীনের সেই নকল গ্রামে যান, তিনি হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তবে বাসিন্দারা প্রথম দিকে ক্ষুব্ধ হলেও পরে তারা বিষয়টিকে গর্বের সাথে গ্রহণ করেন। কারণ, একটি আস্ত গ্রামকে কেউ নকল করছে মানে সেটির সৌন্দর্য সত্যিই অনন্য। তবে কিছু স্থাপত্য নকলের অনুমতি না নেওয়ার বিষয়ে আইনি প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে।

​পর্যটনের জোয়ার ও জীবনের গল্প

​১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো হলস্ট্যাট এবং ডাশ্চটেইন সালসকামার্গাট অঞ্চলকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ ঘোষণা করে। 

তারপর থেকেই বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের ঢল নামে এই ছোট্ট গ্রামে। ২০০১ সালের হিসাব অনুযায়ী, এখানে মাত্র ৮৫৯ জন স্থায়ী বাসিন্দা বসবাস করেন। এই হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ মিলে প্রতি বছর প্রায় দশ লক্ষাধিক পর্যটকের সামাল দেন।


​সারা বিশ্ব থেকে মানুষ আসে এই রূপকথা দেখতে। বিশেষ করে চীনা পর্যটকদের আনাগোনা এখানে আকাশছোঁয়া। পর্যটন এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা হলেও এর একটি অন্ধকার দিকও আছে। হাজার হাজার পর্যটক দ্রুতগতিতে গ্রাম ঘুরে নোংরা ফেলে চলে যান, যা পরিষ্কার করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের হিমশিম খেতে হয়। মাত্র ৮০০ মানুষের ওপর ১০ লক্ষ মানুষের উশৃঙ্খলতার চাপ মাঝেমধ্যে এই শান্ত স্বর্গকে বিষাদময় করে তোলে।

​যেখানে সৌন্দর্যই শেষ কথা

​হলস্ট্যাট আমাদের শেখায়, সৌন্দর্য কেবল প্রাকৃতিক নিসর্গ নয়, সৌন্দর্য হলো ইতিহাসের প্রতি যত্ন এবং মানুষের উন্নত নান্দনিকতা। ৩,৫০০ বছরের পুরনো সেই লবণের খনি থেকে শুরু করে বর্তমানের পর্যটন কেন্দ্র পর্যন্ত-এই গ্রামের প্রতিটি ধূলিকণা সাক্ষী হয়ে আছে মানুষের লড়াই আর ঐতিহ্যের।

​আপনি যদি বিত্তবান হন, তবে হয়তো হ্রদের পাড়ে কোনো বিলাসবহুল হোটেলে রাত কাটাতে পারবেন। আর যদি সাধারণ পর্যটক হন, তবে সালসবার্গের মতো পাশের কোনো শহর থেকে দিনে দিনে ঘুরে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে যেভাবে আসুক না কেন, হলস্ট্যাট থেকে ফিরে যাওয়ার সময় আপনার মনের কোণে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে হ্রদের বুকে পাহাড়ের সেই স্থির ছায়া আর গলি পথে ফুটে থাকা অর্কিডের ঘ্রাণ। হলস্ট্যাট আসলে শুধু একটি গ্রাম নয়, এটি মানুষের তৈরি এক জীবন্ত স্বপ্নের নাম।

আরবিএন 



  বিষয়:   আল্পস  পর্বতমালা  অস্ট্রিয়া  গ্রাম  হলস্ট্যাট 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: