ফিলিস্তিন প্রশ্নের নতুন বাস্তবতা এক রাষ্ট্র সমাধান

আওয়াদ আবদেলফাত্তাহ

আন্তর্জাতিক

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে দুই হাজারেরও বেশিবার লঙ্ঘিত তথাকথিত যুদ্ধবিরতি এবং বিশেষ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র

2026-04-19T02:57:08+00:00
2026-04-19T04:04:24+00:00
 
  সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬,
২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ফিলিস্তিন প্রশ্নের নতুন বাস্তবতা এক রাষ্ট্র সমাধান
আওয়াদ আবদেলফাত্তাহ
প্রকাশ: রোববার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৫৭ এএম  আপডেট: ১৯.০৪.২০২৬ ৪:০৪ এএম
সংগৃহীত ছবি
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে দুই হাজারেরও বেশিবার লঙ্ঘিত তথাকথিত যুদ্ধবিরতি এবং বিশেষ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ফিলিস্তিন ধীরে ধীরে বৈশ্বিক মনোযোগের কেন্দ্র থেকে সরে যাচ্ছে। গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে, ঠিক একই সময়ে ইসরাইল লেবাননে তাদের সবচেয়ে বড় হামলা চালায়। 

যেখানে অন্তত ৩০৩ জন নিহত হয়। আর গাজায় আগের ৪০ দিনের মধ্যে ৩৬ দিনই বোমাবর্ষণ করা হয়েছে এবং অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে অন্তত ৭৩৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই দিনে জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন সতর্ক করে জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের ওপর ক্রমবর্ধমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে ‘আড়ালে নিয়ে গেছে’। মিডল ইস্ট আই।

এই পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি, বরং এটি একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশলের ফল। এর পরিকল্পনাকারীরা পুরো অঞ্চলে তাদের সামরিক আগ্রাসনকে উপস্থাপন করেছে পারমাণবিক বিস্তার রোধ এবং আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা রক্ষার লড়াই হিসেবে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা আসল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে। 

যা হলো একটি বৃহত্তর সাম্রাজ্যবাদী কৌশল, যার লক্ষ্য অঞ্চলকে পুনর্গঠন করা এবং ইসরাইলকে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এর পাশাপাশি আরেকটি সমান্তরাল প্রক্রিয়া চলছে। তা হলো ইসরাইল ও আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ। এই দুটি প্রক্রিয়া মিলেই একটি সুসংগঠিত কৌশল গঠন করেছে, যার লক্ষ্য কার্যত ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে দাফন করা।

বাস্তবে এই সংঘাতের কেন্দ্রেই রয়েছে ফিলিস্তিন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার গাজা, লেবানন ও ইরানে চালানো হামলাকে একটি অভিন্ন অভিযান হিসেবে তুলে ধরেছেন, যার মাধ্যমে তিনি তিনটি ফ্রন্টে ‘নিরাপত্তা বলয়’ গড়ে তুলতে চান। একইভাবে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেছেন, গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফলাফলের ওপর। তিনি এমনও বলেছেন যে দক্ষিণ লেবাননের গ্রামগুলো গাজার রাফাহ ও খান ইউনিসের মতো ধ্বংস করা হবে।

অন্যদিকে, ইরানের নেতৃত্বও এই সংঘাতকে শুধু আত্মরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং তারা এটিকে ফিলিস্তিনি ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করেছে, যা দেখায় যে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে ফিলিস্তিন এখনও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। ইরানি সরকারের নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটের ধারাবাহিক আক্রমণকে ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাদের অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আধিপত্যের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।

সব মিলিয়ে, এখন যা ঘটছে তা একটি বিস্তৃত সংঘাতের ক্ষেত্র, যেখানে ফিলিস্তিন একই সঙ্গে একটি কেন্দ্রীয় লক্ষ্য এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাজনরেখা। এই বাস্তবতা ফিলিস্তিন প্রশ্নকে নতুনভাবে ভাবার দাবি তোলে। এটি আর কেবল একটি স্থানীয় সংঘাত নয়, বরং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক দ্বন্দ্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এক রাষ্ট্র সমাধানের প্রশ্ন : ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক চিন্তায় আবারও ‘এক রাষ্ট্র’ সমাধান গুরুত্ব পাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে গভীর সংকট এবং এই বিশ্বাস যে, এটি সবচেয়ে ন্যায়সংগত ও স্থায়ী সমাধান হতে পারে। দুই রাষ্ট্র সমাধানের ভাঙন, ফিলিস্তিনি জাতীয় আন্দোলনের বিভাজন এবং গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধ- এসব মিলিয়ে নতুন করে কৌশল ও ভবিষ্যৎ ভাবনার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। তবে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের মধ্যে এখনও কোনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি, কীভাবে এই মুহূর্ত থেকে একটি গণতান্ত্রিক এক রাষ্ট্রের দিকে এগোনো যায়। যেমনটি একসময় পিএলও নাকবার পর কল্পনা করেছিল।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এই সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই যুদ্ধে ইসরাইলবিরোধী শক্তিগুলো দুর্বল না শক্তিশালী হবেÑ তার ওপর নির্ভর করবে ফিলিস্তিনে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনার দিকনির্দেশ। স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের কেন্দ্রেও ফিলিস্তিন রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী জোট ফিলিস্তিনি আন্দোলন দমন এবং ইসরাইলের পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথে ইরানকে শেষ বাধা হিসেবে দেখে।

সম্ভাব্য দুইটি চিত্র : যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোট ব্যর্থ হয়, তা হলে তাদের প্রভাব কমবে। উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারাতে পারে এবং ইসরাইলবিরোধী শক্তিগুলো শক্তিশালী হবে। এতে ফিলিস্তিনি আন্দোলন নতুন শক্তি পেতে পারে এবং এক রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবসম্মত হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, যদি এই অভিযান সফল হয়, তা হলে ইসরাইলের আধিপত্য আরও শক্তিশালী হবে। ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়বে, আরব অঞ্চলে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ও স্বাভাবিকীকরণ বাড়বে এবং ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হবে। তবু ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি মুছে যাবে না। কঠিন পরিস্থিতিতেও এক রাষ্ট্র সমাধান একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে টিকে থাকবে।

আন্দোলন পুনর্গঠনের প্রয়োজন : সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অভ্যন্তরীণ; ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সংকট। একটি ঐক্যবদ্ধ ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব ছাড়া কোনো কৌশলই কার্যকর হবে না। জাতীয় আন্দোলনকে পুনর্গঠন করতে হবে, যেখানে তৃণমূল, প্রবাসী ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ থাকবে। বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা আন্দোলন এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে এখন প্রশ্ন শুধু একটি রাজনৈতিক প্রকল্পের নয় ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎই এখানে নির্ধারিত হচ্ছে। এক রাষ্ট্র সমাধান তাই শুধু একটি কৌশল নয়, বরং একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা যা সমতা, ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতার ভিত্তিতে একটি মুক্ত ফিলিস্তিনের স্বপ্ন ধারণ করে।

লেখক : রাজনৈতিক লেখক এবং বালাদ পার্টির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক। তিনি ২০১৭ সালের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠিত হাইফাভিত্তিক ‘ওয়ান ডেমোক্রেটিক স্টেট ক্যাম্পেইন’-এর সমন্বয়কারী। 

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   ফিলিস্তিন  নতুন  বাস্তবতা  রাষ্ট্র  সমাধান 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: