মসজিদভিত্তিক শিক্ষা প্রকল্পে হরিলুট

লোকমান আলী, নওগাঁ

সারাদেশ

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালিত কাগজে-কলমে শিক্ষাকেন্দ্রের নাম দেওয়া আছে ‘লোহাচুড়া পশ্চিম পাড়া কাচারী, রানীনগর’। যেখানে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বে আছেন মোছা. কাজল

2026-04-19T03:24:20+00:00
2026-04-19T03:24:20+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
সারাদেশ
মসজিদভিত্তিক শিক্ষা প্রকল্পে হরিলুট
লোকমান আলী, নওগাঁ
প্রকাশ: রোববার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:২৪ এএম   (ভিজিট : ৫৮)
মসজিদভিত্তিক শিক্ষা প্রকল্প। সংগৃহীত ছবি
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালিত কাগজে-কলমে শিক্ষাকেন্দ্রের নাম দেওয়া আছে ‘লোহাচুড়া পশ্চিম পাড়া কাচারী, রানীনগর’। যেখানে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বে আছেন মোছা. কাজল রেখা নামের এক নারী। তবে তিনি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে পড়ান না। একটি বাড়িতে পড়াচ্ছেন। 

সেই বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়বে ওপরে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের সাইন বোর্ড এবং নিচে হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালনের দৃশ্য। প্রাক-প্রাথমিকের এই কেন্দ্রে ৩০ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা থাকলেও বাড়ির একটি রুমে ৭-৮ জন শিশুকে শিক্ষা দিচ্ছেন কাজল রেখা। তাও আবার নিজের বসত বাড়িতে। যেটা পুরোপুরি নিয়মবহির্ভূত। 

আরেক নারী শিক্ষক মোছা. নুসরাত জাহান সূচি। তিনি কালিগ্রাম ইউনিয়নের আমগ্রাম জামে মসজিদ কেন্দ্রে শিক্ষকতা করেন। তবে সেখানে পাওয়া যায়নি শিক্ষা কার্যক্রমের কোনো অস্তিত্ব। আবার তার বর্তমান কেন্দ্র দেখানো হয়েছে আসমাইল হাজির কাচারী। সেটাও গত তিন বছর থেকে বন্ধ। নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না সমন্বয় মিটিংয়ে। তারপরও বেতন তুলে খাচ্ছেন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। এভাবেই পরিচালিত হচ্ছে নওগাঁর রানীনগর উপজেলায় মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম। 

ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে মসজিদভিত্তিক এই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। অভিযোগ ফাউন্ডেশনের ফিল্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ মুসার অবহেলা ও স্বেচ্ছাচারিতায় পরিচালিত নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, পক্ষপাতমূলক আচরণসহ দুর্নীতির বেড়াজালে পড়ে কার্যক্রম ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আর এসব অনিময়-দুর্নীতির বেড়াজালে জড়িয়ে পড়ায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় এই শিক্ষা প্রকল্পটি উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয় ও লোপাট হচ্ছে। এদিকে জেলার দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঠিক তদারকির অভবে দিন দিন ফিল্ড সুপারভাইজার মুসার অনিয়মের মাত্রা বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন একাধিক শিক্ষকসহ স্থানীয়রা।

অভিযোগ ওঠা মোহাম্মদ মুসা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের রানীনগর উপজেলায় ফিল্ড সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্বে আছেন। আর শিক্ষক মোছা. নুসরাত জাহান সূচি মুসার স্ত্রী এবং কাজল রেখা তার শাশুড়ি। তবে কাজল রেখা মুসার আগেই এখানে চাকরি শুরু করেন।

সরজমিনে বড়গাছা ইউনিয়নের মালশন বড়পুকুরিয়া বাজার জামে মসজিদ, কালিগ্রাম ইউনিয়নের জয়সার জামে মসজিদ ও টংকুড়ি আমজাদ হোসেন টিয়ার কাচারীসহ কয়েকটি মসজিদভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা যায় হতাশাজনক চিত্র। ৩০-৩৫ জন শিক্ষার্থী উপস্থিতি থাকা বাধ্যতামূলক হলেও সেখানে মাত্র ১০-১৬ জনের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। কাগজে-কলমে পরিবেশসম্মত অবকাঠামোর বর্ণনা থাকলেও বাস্তবে এর চিত্র ঠিক উল্টো। মাটির ঘরের বারান্দায় জরাজীর্ণ একটি ছোট জায়গায় চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। 

কোথাও কোথাও কেন্দ্রের বর্তমানে কোনো অস্তিত্ব নেই। কোথাও শিক্ষার্থী এনে কেন্দ্র চালানো হতো। কোথাও চলছে কম শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম। আবার কোথাও ইচ্ছামতো কেন্দ্র পরিবর্তন করে পাঠদান করানো হচ্ছে। কাগজ-কলমে এসব শিক্ষাকেন্দ্রগুলো দেখানো হলেও বাস্তবে শিক্ষা কার্যক্রম ও অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

এদিকে গত বছরগুলোতে নুসরাত জাহান সূচি আমগ্রাম জামে মসজিদ কেন্দ্রের শিক্ষক হিসেবে চাকরি করলেও এই বছর তার নামের পাশে খট্টেশ্বর ইউনিয়নের আসমাইল হাজির কাচারী নামক কেন্দ্র দেখানো হয়েছে। এখানেও কেন্দ্রের অবস্থা একই। গত তিন বছর থেকে নেই কেন্দ্রের কার্যক্রম। অপরদিকে আসমাইল হাজির কাচারী কেন্দ্রটি খট্টেশ্বর ইউনিয়নে দেখানো হলেও বাস্তবে ওই কেন্দ্রের অবস্থান কাশিমপুর ইউনিয়নে। 

আমগ্রামের স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বলেন, তিন বছর আগে এখানে মসজিদভিত্তিক স্কুল ছিল এবং পড়াশোনা হতো। কিন্তু এখন আর ওই কেন্দ্রের কোনো কার্যক্রম নেই, নেই কোনো অস্তিত্ব। 

আসমাইল হাজির কাচারী কেন্দ্রের একজন সাবেক শিক্ষার্থীর মা মোছা. মর্জিনা বেগম বলেন, এখানকার শিক্ষার কার্যক্রম আরও তিন বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। আমার ছেলে এখানে পড়ত। কিন্তু হঠাৎ হুজুর আসা বন্ধ করে দেয়। তারপর দেখি এখানে আর কেউ আসে না।

জানার জন্য ফোন দিলে রিসিভ করে কথা বলেননি শিক্ষক মোছা. নুসরাত জাহান সূচি। আবার ফোন দিলে কেটে দেন অপর প্রান্ত থেকে।

শিক্ষক কাজল রেখা মুঠোফোনে বলেন, পাশেই একটা ব্র্যাক স্কুল ছিল। সেখানেই চাকরি করতাম। পরে ২০১৪ সালে ইসলামি ফাউন্ডেশনের চাকরিতে যোগদান করে সেখানেই কেন্দ্র করা হয়। কিন্তু কাজ চলার কারণে গত এক বছর থেকে বাড়িতে পড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে নতুন ২৬ ও পুরাতন ৪ জন শিক্ষার্থী আছে। ঈদের ছুটির পর একদিন ৭-৮ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত হয়েছিল। তা ছাড়া প্রতিদিন প্রায় ১৬-১৭ এমনকি ২০ জনও উপস্থিত থাকে। আমার একটা সুনাম আছে এবং আমি প্রতি মাসিক সমন্বয় মিটিংয়ে উপস্থিত থাকি। অল্পদিনের মধ্যে এখান থেকে আমি অন্য জায়গায় চলে যাব।
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষকসহ অনেকে অভিযোগের সুরে বলেন, নওগাঁ জেলার সংশ্লিষ্ট অফিসারের সঠিক তদারকি না থাকার কারণে ফিল্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ মুসার স্বেচ্ছাচারিতা, দায়িত্বে অবহেলা দিন দিন বেড়ে গেছে। আর তিনি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করার কারণেই এমন পরিস্থিতিতে চলছে সরকারের নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় এই শিক্ষা কার্যক্রম। ফলে এই প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে গ্রামীণ জনপদের শিক্ষার্থীরা। আর মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি চলে আসছে।  

এ বিষয়ে উপজেলার সচেতন মহল নিরপেক্ষ কমিটি গঠনের মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত করে ফাউন্ডেশনের ফিল্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ মুসাসহ জড়িত‌দের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রানীনগর উপজেলার ফিল্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ মুসা মুঠোফোনে বলেন, আমি ফোনে মন্তব্য করতে বা তথ্য দিতে রাজি না। আপনি অফিসে আসেন। যা জানার জানতে পারবেন। 

সব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নওগাঁর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক মো. মারুফ রায়হান মুঠোফোনে বলেন, কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেখানে কেন্দ্র নেই এবং সচল নেই সেগুলোর তথ্য দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া বাড়িতে কেন্দ্র করা যাবে, তবে সেটা কিছু সময়ের জন্য এবং বাড়ির পাশে আলাদা একটা নির্দিষ্ট স্থানে কেন্দ্র হবে। বাড়ির রুমের মধ্যে করার সুযোগ নেই। তবে মুসার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনতে পেয়েছি। আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব বলেও জানালেন তিনি।

রানীনগর উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাকিবুল হাসান বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্র্তৃৃক পরিচালিত শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে কাম্যসংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও তারা নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে আসেন না। আবার এই বিষয়টি কেন্দ্রের শিক্ষকগণ জানাতে চান না। তবে অনেক ক্ষেত্রে কাম্যসংখ্যক শিক্ষার্থী না পাওয়ায় কেন্দ্র পরিবর্তন করারও প্রয়োজন হয়েছে। তাই বিগত অর্থবছরে থাকা ৮৯টি কেন্দ্র যাচাই করে বর্তমানে ৭৪টি কেন্দ্র চলমান রয়েছে। তারপরও সব অভিযোগের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান উপজেলার ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা। 

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   মসজিদভিত্তিক  শিক্ষা  প্রকল্প হরিলুট 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: