মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত আকাশে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে মাত্র কয়েক দিন বাকি। বুধবার শেষ হচ্ছে দুই সপ্তাহের সেই সাময়িক বিরতি। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, শান্তিচুক্তি হবেই। তা সে সুন্দর পথে হোক বা কঠিন পথে। অন্যদিকে ইরানের প্রধান আলোচক জানিয়েছেন, আলোচনায় অগ্রগতি হলেও চূড়ান্ত চুক্তি থেকে তারা এখনও অনেক দূরে। মার্কিন অবরোধ জারি থাকলে আলোচনার টেবিলে বসতেও নারাজ তেহরান।
দেশটির সেনাপ্রধান জানিয়েছেন, ট্রিগারে আঙুল রেখে প্রস্তুত রয়েছে ইরান। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এরই মধ্যে ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন মার্কিন প্রতিনিধিরা। এ পরিস্থিতিতে আগামীকাল মঙ্গলবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন যে, ইরান যুদ্ধবিরতির ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ করেছে। তবে এই লঙ্ঘন সত্ত্বেও তিনি একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর ব্যাপারে আশাবাদী। এবিসি নিউজের সাংবাদিক জোনাথন কার্লকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘শান্তি চুক্তি হবেই। ভালো পথে হোক বা কঠোর পন্থায়; যেকোনো ভাবেই এটি ঘটবে। এটি নিশ্চিত।’ ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, আমরা খুব ন্যায্য ও যৌক্তিক একটি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছি।
আমি আশা করি ইরান তা গ্রহণ করবে। কারণ তারা যদি না করে, তা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও প্রতিটি সেতু গুঁড়িয়ে দেবে। একই পোস্টে তিনি ইরানকে যুদ্ধবিরতির ‘চরম লঙ্ঘনকারী’ বলে অভিযোগ করেন। তার দাবি, হরমুজ প্রণালিতে ইরান একটি ফরাসি ও একটি ব্রিটিশ জাহাজে গুলি চালিয়েছে। যদিও ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেছে যে, মার্কিন নৌ অবরোধই যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করেছে।
তবে রোববার যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বজায় থাকা অবস্থায় আলোচনার জন্য পাকিস্তানে কোনো প্রতিনিধি দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। দেশটির তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়েছে। তাসনিমের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ‘ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নৌ অবরোধ যতক্ষণ কার্যকর থাকবে, ততক্ষণ কোনো আলোচনা হবে না।’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবরোধ বহাল রেখে আলোচনার টেবিলে বসার কোনো পরিকল্পনা বর্তমানে তেহরানের নেই।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রোববার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘তেহরান যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না। যেকোনো মুহূর্তে আবার লড়াই শুরু হতে পারে। তিনি জানান, সাম্প্রতিক আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বড় বড় বিষয়ে এখনও ব্যবধান রয়ে গেছে। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এই দুটি ইস্যুতেই উভয় পক্ষ অনড়। ‘উভয়পক্ষই এখনও চূড়ান্ত আলোচনার পর্যায় থেকে অনেক দূরে,’ বলেন গালিবাফ। ওদিকে ইসরাইলি রেডিও জানিয়েছে, যেকোনো সময় যুদ্ধবিরতি ভেঙে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে ‘হাই অ্যালার্টে’ রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনা শুরুর কথা চলছে। ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ পত্রিকাকে রোববার ট্রাম্প এ কথা জানান। হোয়াইট হাউস থেকে এক ফোনকলে তিনি বলেন, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনার আগে সোমবার রাতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছবেন। মঙ্গলবার এই আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, বৈঠকে তার জামাতা জ্যারেড কুশনারও অংশ নেবেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়েছে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সফর।
ট্রাম্প এবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, শুধু নিরাপত্তার কারণেই জেডি এই সফরে যাচ্ছেন না। তিনি অত্যন্ত দক্ষ একজন মানুষ। তবে পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্রগুলো আল জাজিরাকে জানিয়েছে, ইসলামাবাদের পরিস্থিতি বেশ টালমাটাল। দুটি মার্কিন সি-১৭ গ্লোবমাস্টার সামরিক বিমান রাওয়ালপিন্ডির নূর খান বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেছে। ইসলামাবাদের ‘রেড জোনের’ রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর গতবার যে সেরেনা হোটেলে আলোচনা হয়েছিল, সেখান থেকে অতিথিদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সেখানে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত নতুন বুকিং বন্ধ রাখা হয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে এখনও নিশ্চিত করা হয়নি যে তারা এই আলোচনায় অংশ নেবে কি না। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদে বলেন, নতুন করে মুখোমুখি আলোচনার কোনো তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি। তিনি ওয়াশিংটনের ‘ম্যাক্সিমালিস্ট’ দাবি ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানানোর তীব্র সমালোচনা করেন।
এখন এই যুদ্ধের কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই পথে চলাচল করে। গত শনিবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ঘোষণা দেয়, যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর ও জাহাজের ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নেবে, ততক্ষণ এই প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। এর আগে ইরান জানিয়েছিল, নির্দিষ্ট ফি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে।
কিন্তু সেই শর্ত প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। আইআরজিসি সতর্ক করে দিয়েছে, কোনো জাহাজ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। অন্যদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ১২টির বেশি যুদ্ধজাহাজ, ১০ হাজারের বেশি সেনা ও যুদ্ধবিমান নিয়ে তারা ইরানের বন্দরগুলোতে কঠোর নৌ অবরোধ করছে। এ পর্যন্ত ইরান-সংশ্লিষ্ট ২৩টি জাহাজকে আটকিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ট্রাম্প নিজেও দাবি করেছেন, ইরান প্রণালি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে, যা অদ্ভুত। কারণ আমাদের অবরোধ তো আগেই এটি বন্ধ করে রেখেছে। তারা না বুঝেই আমাদের সাহায্য করছে।
এদিকে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি জানিয়েছেন, স্থল, আকাশ ও সমুদ্র যেকোনো পথেই দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনী বদ্ধপরিকর। আমাদের সেনাদের আঙুল এখন বন্দুকের ট্রিগারে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি বলেছেন, ইরানের নৌবাহিনী শত্রুদের ‘নতুন ও তিক্ত পরাজয়’ উপহার দিতে প্রস্তুত। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন, ট্রাম্প বলছেন, ইরান তার পারমাণবিক অধিকার ভোগ করতে পারবে না। কিন্তু একটি জাতিকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ট্রাম্প কে?
এ পরিস্থিতিতে শুধু ইরান নয় আঞ্চলিক অঙ্গনেও বাড়ছে অস্থিরতা। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ট্রাম্প যদি ‘শান্তি প্রক্রিয়ায় বাধা’ দিতে থাকেন, তবে তারা বাব আল-মানদিব প্রণালি বন্ধ করে দেবে।
হুথিদের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুসেইন আল-এজি এক্সে লিখেছেন, সানা যদি এই প্রণালি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে মানুষ বা জিন- কারও পক্ষেই তা আবার খোলা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে ইসরাইলে হাজারো মানুষ শনিবার রাতে তেল আবিবে বিক্ষোভ করেছে। তারা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সেøাগান দিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা দাবি করেছে, ৭ অক্টোবর ও পরবর্তী সময়ে কী ঘটেছিল, তার স্বতন্ত্র তদন্ত হোক।
এসবের মধ্যে সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় ট্রাম্প এমন একটি যুদ্ধ শুরু করেছেন যা আমেরিকার জনগণ চায় না। তবে নেতানিয়াহু তা নাকচ করে বলেছেন, কেউ কি সত্যিই মনে করেন যে কেউ এসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলে দিতে পারে তার কী করা উচিত?
চলমান এ উত্তেজনার মধ্যে ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বুধবারের মধ্যে যদি দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তি না হয়, তবে তিনি ‘পুনরায় বোমা বর্ষণ শুরু করবেন’। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত দাবি’ ত্যাগ করা এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতার সঙ্গে দাবির সমন্বয় ঘটানো জরুরি। ততদিন পর্যন্ত আলোচনা স্থগিত থাকতে পারে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল জানিয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরান সফরে গিয়ে মার্কিন পক্ষের কিছু নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন। সেগুলো ইরান পর্যালোচনা করছে, কিন্তু এখনও কোনো জবাব দেয়নি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের ‘হার্ড ওয়ে’ বলতে ইরানের পরমাণু স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই তিনি ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরানও সম্পূর্ণ নীরব নয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। যুদ্ধবিরতি ভাঙার আগে শেষ কথাটি বলার পালা এখন কূটনীতিকদের।
পাকিস্তানের মতো একটি দেশ মধ্যস্থতা করলেও, দুই পক্ষের দূরত্ব যেন সহজে মেটার নয়। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ‘শান্তি চুক্তি হবেই- সুন্দর পথে হোক বা কঠিন পথে।’ এখন দেখার বিষয়, বুধবারের মধ্যে কোন পথটি বেছে নেয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।
সূত্র : আলজাজিরা, বিবিসি, মিডল ইস্ট আই, এপি, রয়টার্স, এএফপি ও এবিসি নিউজ
সময়ের আলো/কেএইচও