ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত ও প্রায় ৭০ জন আহত হওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সের যাচাই করা ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাড়িটিতে সরাসরি মার্কিন অস্ত্রের আঘাতেই বিস্ফোরণটি ঘটে থাকতে পারে। এটি অন্য কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের পর ক্ষেপণাস্ত্রের দিক পরিবর্তন হয়ে আঘাত করার ঘটনা নয় বলেই তাদের ধারণা।
মঙ্গলবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কুহেস্তাক শহরে একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক ডজন মানুষ। অনুষ্ঠান চলাকালে বাড়িটির ছাদে একটি অস্ত্র আঘাত হানে বলে ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে। বিস্ফোরণে বাড়িটির ছাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভেতরে থাকা বিয়ের সাজসজ্জা ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে।
রয়টার্স ঘটনাটির ছবি ও ভিডিও চারজন সামরিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞকে দেখায়। তাদের সবাই বলেন, ক্ষয়ক্ষতির ধরন সরাসরি আঘাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনজন বিশেষজ্ঞের মতে, ব্যবহৃত অস্ত্রটি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের। একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, অস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে গিয়ে ভুল করে ওই বাড়িতে আঘাত করে থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ১ সেপ্টেম্বর কুহেস্তাক এলাকায় মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল শহরের একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার। স্যাটেলাইট ছবির তথ্য অনুযায়ী, টাওয়ারটি বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল থেকে প্রায় ১৩৫ মিটার দূরে।
অস্ত্র বিশেষজ্ঞ ট্রেভর বল বলেন, বাড়িটির ছাদে বা ছাদের ঠিক ওপর বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে ক্ষয়ক্ষতির ধরন থেকে মনে হচ্ছে। তার মতে, এটি সরাসরি আঘাতের ঘটনা এবং অস্ত্রটি সম্ভবত মার্কিন। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা গ্যারেথ কোলেটও এই বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত হন। তার মতে, এটি ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০০ পাউন্ড ওজনের বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো ওই হামলার দায় স্বীকার করেনি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীও বলেছে, তারা হামলার খবর সম্পর্কে অবগত এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে তারা দাবি করেছে, মার্কিন বাহিনী কখনো বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।
হামলায় নিহতদের মধ্যে বিয়ের অনুষ্ঠানের তিন অতিথি ছিলেন—৪৩ বছর বয়সী কলসুম মোল্লাহী নেজানদনিয়া, ৫০ বছর বয়সী জারখাতুন তাহেরি এবং চার বছর বয়সী আমির মোহাম্মদ করিমি। এ ছাড়া ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ মাল্লাহি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারের কাছে মোটরসাইকেল চালানোর সময় নিহত হন। পরে ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও এক ২২ বছর বয়সী নারী মারা গেছেন। এতে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচজনে।
ঘটনার পর কুহেস্তাকে নিহতদের জানাজা ও দাফনে মানুষের ঢল নামে। চার বছর বয়সী আমির মোহাম্মদ করিমির ছোট কফিনে ফুল ছুড়ে দেন শোকাহতরা। স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, পুরো সিরিক এলাকায় শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে এবং মানুষ এখনো এই ঘটনায় হতবাক।
এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭৫ জনের বেশি শিশু ও শিক্ষক নিহত হওয়ার দাবি করেছিল ইরান। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রাথমিক তদন্তে ওই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী দায়ী হওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছিল। তবে পেন্টাগন এখনো তদন্তের ফল প্রকাশ করেনি।
সময়ের আলো/কেএইচ