যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক মাসের বিরতির পর ফের তীব্র হয়েছে সামরিক সংঘাত। সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় ইরানের নৌবাহিনীর ছয় সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম। এর জবাবে কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। পাল্টাপাল্টি হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও বাড়ছে। পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানায়, গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো নতুন দফার হামলায় ইরানের নৌবাহিনীর ছয় সদস্য নিহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে নিয়মিত সামরিক বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। তবে তাদের পরিচয়, হামলার নির্দিষ্ট স্থান এবং কী পরিস্থিতিতে তারা নিহত হয়েছেন— এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত ছয় সামরিক সদস্যের মধ্যে তিনজন পাইলটও রয়েছেন। এ নিয়ে চলতি সপ্তাহে মার্কিন হামলায় ইরানের সামরিক বাহিনীর নিহতের সংখ্যা অন্তত ১৩-তে দাঁড়িয়েছে।
কুয়েত ও আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা : ইরানি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরে ‘সায়েকেহ’ বা ‘বজ্রপাত’ অভিযানের ৩১তম ধাপে এসব হামলা চালানো হয়। ইরানের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে কুয়েতে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত আহমেদ আল-জাবের বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। সেখানে যোগাযোগব্যবস্থা এবং যুদ্ধবিমান রাখার হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করা হয়। ইরানি সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আল-জাবের বিমানঘাঁটি পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ রসদ ও সহায়তা কেন্দ্র। আঞ্চলিক বিমান অভিযান ও নজরদারি কার্যক্রমেও ঘাঁটিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল মিনহাদ বিমান ঘাঁটিতেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। সেখানে সেনা মোতায়েনের এলাকা ও রাডার ব্যবস্থা লক্ষ্য করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ইরানি সেনাবাহিনী বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলার জবাব আরও কঠোরভাবে দেওয়া হবে।
তাদের ভাষ্য, ইরানি বেসামরিক নাগরিক ও সামরিক সদস্যদের মৃত্যুর প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত পাল্টা অভিযান চলবে। এর আগে ইরানের হামলার জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আরও হামলার হুমকি দিয়েছিলেন।
বেসামরিক হতাহতে বাড়ছে উদ্বেগ : সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের হতাহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে ইরানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনাও রয়েছে। গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জানিয়েছেন, জাতিসংঘের মহাসচিব অবিলম্বে সামরিক তৎপরতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সব ধরনের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন গুতেরেস। একই সঙ্গে সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে চলার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে হামলার ক্ষেত্রে পার্থক্যকরণ, আনুপাতিকতা এবং বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের নীতিও রয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকটও আলোচনায় : ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সমর্থকরা দেশটির বেসামরিক প্রাণহানির আরেকটি কারণ হিসেবে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করছেন। এই বিক্ষোভের ঘটনা ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের আগের। এইচআরএএনএর হিসাবে, ওই দমন-পীড়নে ৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে বিদেশে অবস্থানরত ইরানি গোষ্ঠীগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণ হিসেবে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দেওয়া সহায়তা বন্ধ করা এবং ইরানিদের নিজেদের সরকার পরিবর্তনের সুযোগ তৈরির কথাও বলেছেন।
হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে ঝুঁকি : যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক প্রভাব পড়তে পারে হরমুজ প্রণালিতে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের অনুমতি ছাড়া চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজগুলোকে হুমকি দিয়েছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
সাম্প্রতিক উত্তেজনায় জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার প্রভাব ইতিমধ্যে তেলের বাজারেও পড়ছে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
সংঘাত কি আরও ছড়াবে : এক মাসের আপেক্ষিক শান্তির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সরাসরি হামলা-পাল্টাহামলা শুরু হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য মাইন স্থাপনের হুমকি ঠেকাতেই তাদের অভিযান। অন্যদিকে ইরান এসব হামলাকে আগ্রাসন হিসেবে দেখছে এবং পাল্টা আঘাতের ঘোষণা দিচ্ছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ। কারণ সামরিক সংঘাত যদি আরও বাড়ে, তার প্রভাব শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এবং আঘাত হানতে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থায়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা