ইসরাইলি কারাগারে নিজের সন্তানকেও ভুলে গিয়েছিলাম

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

প্রতি রাতেই একই দুঃস্বপ্নে জেগে ওঠেন শরাফি। করিডোরে বুটের শব্দ, অন্ধকারে চিৎকার করে নাম ডাকা, আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। এখনও মনে

2026-04-20T03:09:07+00:00
2026-04-20T03:09:07+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইসরাইলি কারাগারে নিজের সন্তানকেও ভুলে গিয়েছিলাম
ফিলিস্তিনি মা সাঈদা আল-শরাফির বন্দিজীবনের করুণ কাহিনি
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:০৯ এএম 
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মুক্তির পর ছেলে আদম (বাঁয়ে) প্রথমে তার মা সাঈদা আল-শরাফিকে চিনতে পারেনি। ছবি : মিডল ইস্ট আই
প্রতি রাতেই একই দুঃস্বপ্নে জেগে ওঠেন শরাফি। করিডোরে বুটের শব্দ, অন্ধকারে চিৎকার করে নাম ডাকা, আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। এখনও মনে হয় সেই ছোট্ট সেলেই বন্দি আছি। গাজায় ফিরে এসেও সেই দুঃস্বপ্ন পিছু ছাড়েনি। সাঈদা আল-শরাফি একজন ফিলিস্তিনি মা, যার জীবন যুদ্ধের মাঝে নতুন করে ভেঙে গেছে। 

২০২৩ সালের শেষ দিকে উত্তর গাজা থেকে মানুষের ঢল নামার সময় তিনি ছিলেন তাদেরই একজন। ইসরাইলি বাহিনীর নির্দেশে সবাই দক্ষিণে যাচ্ছিল। সেনাবাহিনী যাকে ‘নিরাপদ করিডোর’ বলেছিল, সেই পথ ধরে বের হন সাঈদাও। সঙ্গে ছিলেন তার শ্বশুর ইউসুফ এবং দুই ছোট সন্তান তিন বছরের জায়ন আল-দিন আর এক বছরের শিশু আদম। চারদিকে গোলাবর্ষণ, ধ্বংস আর আতঙ্ক। একটাই লক্ষ্য বেঁচে থাকা। যুদ্ধের আগে তিনি জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে সাধারণ জীবন কাটাতেন। স্বামী মোহাম্মদ ছিলেন সংগীতশিল্পী। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি নিখোঁজ হন। কয়েক সপ্তাহ পর ইসরাইলি বোমায় তাদের বাড়ি ধ্বংস হলে সাঈদা সন্তানদের নিয়ে পালিয়ে যান। তখনও তিনি জানতেন না, সামনে অপেক্ষা করছে আরও ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতা।

সালাহ আল-দিন সড়কের একটি তল্লাশিচৌকির কাছে পৌঁছালেই হঠাৎ লাউডস্পিকার বেজে ওঠে। একজন সেনা তাকে লক্ষ্য করে ডাকে, বেগুনি শাল পরা নারী, আপনার ছেলেকে পাশের লোকটির কাছে দিন, তারপর আমাদের দিকে আসুন। সেই কথাগুলো এখনও কানে বাজে শরাফির। ছোট আদম আতঙ্কে তার কাপড় আঁকড়ে ধরে। কিন্তু বাধ্য হয়ে তাকে শ্বশুরের হাতে তুলে দিতে হয়। 

চোখে পানি নিয়ে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন- ফিরে আসবেন। কিন্তু তখন তিনি নিজেও জানতেন না, আদৌ ফিরতে পারবেন কি না। সেনাদের কাছে যেতেই তাকে বেঁধে ফেলা হয়। দুই নারী সেনা তাকে একটি অস্থায়ী তাঁবুর ভেতর নিয়ে যায়। সেখানে তাকে পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয়। এরপর মাটিতে ফেলে চোখ বেঁধে মারধর করা হয়। শরাফি বলেন, ওরা আমাকে কাপড় খুলতে বলল, তারপর মাটিতে ফেলল এবং চোখ বেঁধে মারতে শুরু করল।

জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে প্রথম তাকে ৭ অক্টোবরের হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। তিনি বারবার বলেন তিনি একজন গৃহিণী, এর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু কেউ শোনে না বরং সন্তানদের নিয়ে ভয় দেখানো হয়। বলা হয়, সন্তানরা তাদের হেফাজতে আছে, প্রশ্নের উত্তর না দিলে তাদের ছাড়া হবে না। এরপর আবার মারধর। তাকে অন্য বন্দিদের সঙ্গে একটি ট্রাকে তোলার চেষ্টা করা হয়। তিনি প্রতিরোধ করেন। কিন্তু সেনারা হাত-পা ধরে টেনে ট্রাকের ভেতর ছুড়ে ফেলে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার ছয় সপ্তাহের বন্দিজীবন। সে এমন এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা, যা তার জীবন চিরতরে বদলে দেয়।

চোখবাঁধা অবস্থায় তাকে একটি অজানা স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছেই আবার মারধর, গালাগাল, অপমান। তিনি বুঝতে পারেন, কোনো বন্দিশালা বা কারাগারে আনা হয়েছে। চারপাশে আতঙ্ক। একসময় পাশ থেকে এক নারী পানি চাইছিল। হঠাৎ কুকুর ছাড়া হয়। জোরে ঘেউ ঘেউ, শরীরে লালা পড়ার অনুভূতি সব মিলিয়ে আতঙ্কে কেঁপে ওঠেন সাঈদা। ‘আমি ভয়ে কাঁপতে শুরু করি, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি,’ বলেন তিনি। 

পরবর্তী সময়ে তাকে ও অন্যদের বাসে করে স্থানান্তর করা হয়। পুরো পথ চোখবাঁধা, সঙ্গে মারধর আর গালাগাল। চোখের বাঁধন খোলার পর তিনি দেখেন একটি ছোট কক্ষ, যেখানে আরও ছয়জন নারী বন্দি। সময়ের সঙ্গে বন্দির সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিন্তু প্রথম সপ্তাহে কেউ জানত না, তারা কোথায় আছে বা কেনই বা আটক। প্রথম দিকে তিনি কারও সঙ্গে কথা বলতে চাননি। কারও ওপর ভরসা করতে পারছিলেন না। শুধু সন্তানদের কথাই ভাবতেন। তৃতীয় দিন থেকে একে একে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বন্দিদের নিয়ে যাওয়া শুরু হয়। কেউ ফিরে এসে কথা বলতে পারত না। কেউ আবার একাকী সেলে পাঠানো হতো।

অবশেষে তার জিজ্ঞাসাবাদের পালা আসে। একই প্রশ্ন বারবার- সে কী করে, কেন সেখানে, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। তাকে বলা হয়, সত্য না বললে সন্তানদের হত্যা করা হবে, গাজায় থাকা পরিবারকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হবে। একসময় আরেক নারী জিজ্ঞাসাবাদক একই প্রশ্ন শুরু করে। চাপ, ভয় আর অনিশ্চয়তায় ভেঙে পড়ছিলেন সাঈদা। তিনি বলেন, আমি প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। একপর্যায়ে বলে ফেলেন, আমার সন্তানরা মারা গেছে। জিজ্ঞাসাবাদক মনে করেন তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন, প্রশ্ন থামিয়ে দেন।

জিজ্ঞাসাবাদের পর এক দিন তাদের বলা হয়, ছেড়ে দেওয়া হবে, গাজায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় নেগেভ মরুভূমির ডিমোনা কারাগারে। সেখানে পৌঁছেই আবার অপমান আর মারধর। এক প্রহরী তার কানে ফিসফিস করে বলে, তুমি ডিমোনায় আছ। তুমি নরকে আছ। সেই কথাগুলো যেন তার বন্দিজীবনের সারাংশ হয়ে ওঠে।

তাকে প্রায় আড়াই মিটার লম্বা ও দেড় মিটার চওড়া একটি ছোট কক্ষে রাখা হয়। কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে গাদাগাদি করে রাখা হয় ১২ জন নারীকে। খাবার ছিল খুবই কম। পানির মান ছিল নোংরা। একটি মাত্র শৌচাগার সবাইকে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হতো। চিকিৎসার কোনো সুযোগ নেই। কথা বলাও নিষিদ্ধ। ‘এটা সহ্য করার মতো ছিল না,’ বলেন তিনি।

সেই সেলের ভেতরই ঘটে মর্মান্তিক এক ঘটনা। গাজা থেকে আটক হওয়া ২৪ বছর বয়সি এক গর্ভবতী নারী সেখানেই গর্ভপাত করেন। তাকে বলা হয়েছিল, তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কোনো চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয়নি। বন্দিরাই তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করেন। এই দৃশ্য সাঈদার মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে।

তল্লাশি ছিল নিয়মিত। একবার তল্লাশির সময় প্রহরীরা তার পরিবারের মৃত্যুর কথা বলে কটাক্ষ করে। তিনি কাঁদতে শুরু করলে তারা উপহাস করে। চাপ বাড়তে বাড়তে তিনি আতঙ্কে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পুরো বন্দিজীবনে তিনি পরিবারের কোনো খবর পাননি। নতুন করে কেউ এলে তার কাছ থেকেই কিছু তথ্য পাওয়া যেত সেটাও বেশিরভাগ সময় দুঃসংবাদ।

২০২৪ সালের ১২ জানুয়ারি সকাল ৮টার দিকে তাদের আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে রাফাহতে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে বহু পরিবার অপেক্ষা করছিল। সাঈদাকে প্রথমে দেখতে পান তার খালা। তিনি ছুটে গিয়ে সন্তানদের খোঁজ করেন। তখন তাকে জানানো হয় তার পরিবারের ৫০ জনের বেশি সদস্য নিহত হয়েছেন। তার ভাই ও শ্বশুরও সেই তালিকায়। তবে তার সন্তানরা বেঁচে আছে। যখন তিনি সন্তানদের আবার বুকে জড়িয়ে ধরেন, তখনও বিশ্বাস করতে পারেননি। কিন্তু এই ফিরে পাওয়া সম্পূর্ণ ছিল না। ‘বাড়িতে ফেরার পর আমার ছোট ছেলে আদম আমাকে চিনতে পারেনি। সে আমাকে দেখে ভয় পেয়েছিল,’ বলেন তিনি।

এই মুহূর্তটি তার কাছে ছিল মুক্তির পর সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতা। যুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু বন্দিদশা শেষ হয় না মুক্তি পাওয়ার পরও তার জীবনে বন্দিদশা শেষ হয়নি। প্রতিদিন তিনি কারাগারের কথা ভাবেন। রাতে ঘুমাতে গেলে মনে হয় অন্য বন্দিরা কী অবস্থায় আছে? তারা খাবার পাচ্ছে কি না, তাদের সেলে আবার তল্লাশি হচ্ছে কি না? এই প্রশ্নগুলো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ২০২৩ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি আটক হয়েছে। শুধু গাজা নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীরেও প্রতিদিন অভিযান চালিয়ে বহু মানুষকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। বর্তমানে ইসরাইলি কারাগারে ৯ হাজার ৬০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি ও আরব বন্দি রয়েছেন। তাদের প্রায় অর্ধেকই কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই আটক।

১৭ এপ্রিল ফিলিস্তিনি বন্দি দিবস উপলক্ষে অধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, বন্দিরা ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নির্যাতনের মুখে আছেন। গত তিন বছরে হাজার হাজার বন্দির বিরুদ্ধে গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। অন্তত ৮৯ জন বন্দির মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। অনেক বন্দি এখনও নিখোঁজ।

সাঈদা আল-শরাফি বলেন, ফিলিস্তিনি বন্দিরা এমন এক অন্ধকার জগতে বাস করেন, যেখানে নির্যাতন মানুষের মানসিক শক্তি ভেঙে দিতে পারে। তার নিজের জীবন সেই অভিজ্ঞতায় চিরতরে বদলে গেছে। তবু তিনি একটি আশা আঁকড়ে ধরে আছেন, ‘আমি এখনও সেই একই প্রার্থনা করি, যা কারাগারে করতাম। ফিলিস্তিনি বন্দিদের যেন ভুলে যাওয়া না হয় এবং তারা যেন দ্রুত মুক্তি পায়।’



  বিষয়:   ইসরাইল  কারাগার  ফিলিস্তিনি মা  সাঈদা আল-শরাফির  বন্দিজীবন 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: