ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ৩৬ জন প্রার্থীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের ঘোষিত তালিকায় যেমন এসেছে একাধিক নতুন মুখ ও চমক, তেমনি আলোচনায় থাকা বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেত্রী এবং পরিচিত ব্যক্তিত্ব শেষ পর্যন্ত জায়গা পাননি। তালিকায় স্থান পাওয়াদের মধ্যে সংসদ সদস্য ছিলেন ৯ জন।
মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক সুবর্ণা ঠাকুরের স্থান পাওয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মনোনীতদের নাম ঘোষণা করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
আরও পড়ুন
যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়ার আগে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দুই দিনব্যাপী বিস্তৃত সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সেই প্রক্রিয়া শেষে মনোনয়ন বোর্ড চূড়ান্তভাবে ৩৬ জনকে মনোনীত করে।
ঘোষিত তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এবার নতুনদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বেশি। মোট ২৭ জন নারী প্রথমবারের মতো বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য হতে যাচ্ছেন।
তারা হলেন- নেওয়াজ হালিমা আর্লি, মোছাম্মত ফরিদা ইয়াসমিন, শাকিলা ফারজানা, নিপুণ রায় চৌধুরী, জীবা আমিনা খান, মাহমুদা হাবিবা, সাবিরা সুলতানা, সানসিলা জেবরিন, সানজিদা ইসলাম তুলি, ফাহমিদা হক, আন্না মিঞ্জ, সুবর্ণা শিকদার(ঠাকুর), শামীম আরা বেগম স্বপ্না, ফেরদৌসী আহমেদ, বিথীকা বিনতে হুসাইন, সুরাইয়া জেরিন, মানছুরা আক্তার, জহরত আদিব চৌধুরী, মমতাজ আলম, ফাহিমা নাসরিন, আরিফা সুলতানা রুমা, সানজিদা ইয়াসমিন, নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আর আক্তার, মাধবী মারমা, সেলিনা সুলতানা নিশিতা ও রেজেকা সুলতানা।
বিএনপির মিডিয়া সেলের অন্যতম সদস্য শায়রুল কবির খান সময়ের আলোকে জানান, তালিকার বাকি ৯ জন এর আগেও সংসদ সদস্য ছিলেন। তারা হলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, শিরিন সুলতানা, রেহানা আক্তার রানু, শাম্মী আক্তার, রাশেদা বেগম হীরা, বিলকিস ইসলাম, হেলেন জেরিন খান, নিলুফার চৌধুরী মনি ও সুলতানা আহমেদ।
তালিকায় এমন ২ জন নারী স্থান পেয়েছেন, যাদের স্বামী, বাবা কিংবা শ্বশুর সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হয়েছেন। এরা হলেন বিএনপির নির্বাহী সদস্য ও ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুন রায় চৌধুরী। তার বাবা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, আর শ্বশুর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। আরেকজন হলেন শিরিন সুলতানা, তিনি নিজেও মহিলা দলের সভাপতি ছিলেন এবং বর্তমানে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক। তার স্বামী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন নরসিংদী-১ আসনের সংসদ সদস্য।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছেন এমন ৩ জনও সংরক্ষিত কোটায় সংসদ সদস্য হতে যাচ্ছেন। এরা হলেন, ঢাকা-১৪ আসনের সানজিদা ইসলাম তুলি, যশোর-২ আসনের সাবিরা সুলতানা, শেরপুর-১ আসনের সানসিলা জেবরিন।
মহিলা দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হেলেন জেরিন খান। বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন ২ জন। তারা হলেন মাহমুদা হাবিবা ও শাম্মী আক্তার।
ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন ৩ জন। তারা হলেন, ফেরদৌস আহমেদ, আরিফা সুলতানা, নাদিয়া পাঠান।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে ১ জন মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি হলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মানসুরা আক্তার। তিনি এবারের সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হবেন। তার বাবা প্রয়াত বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী।
তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দলের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়, এমন কয়েকজন সংরক্ষিত কোটায় মনোনয়ন পেয়েছেন। এদের মধ্যে একজন হলেন- জহরত আবিদ চৌধুরী। তিনি মোবাইল অপারেটর বাংলা লিংকের সিইও।
এ ছাড়া মনোনয়ন পেয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বিথিকা বিনতে হোসাইন।
হেভিওয়েট মনোনয়ন পাননি যারাচূড়ান্ত তালিকায় জায়গা না পাওয়া উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস, সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা, মহিলা দলের সহসভাপতি নাজমুন নাহার বেবী, প্রয়াত নেতা মওদুদ আহমদের সহধর্মিণী হাসনা জসীমউদ্দীন মওদুদ, কণ্ঠশিল্পী বেবি নাজনীন, ছোটপর্দার অভিনেত্রী রুকাইয়া জাহান চমক।
মনোনয়ন না পাওয়া একাধিক নেত্রীকে নয়াপল্টন দলীয় কার্যালয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। তাদের অভিযোগ, অনেক ত্যাগী নেত্রীদের বাদ দেয়া হয়েছে। গত শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার শুরু করে বিএনপি। মনোনয়ন-প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেন দলটির মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা।
শনিবারও (১৮ এপ্রিল) বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে পাঁচ বিভাগের ৫৪৫ জন মনোনয়ন-প্রত্যাশীর সাক্ষাৎকার নেয় দলটির মনোনয়ন বোর্ড। এতে সভাপতিত্ব করেন বোর্ডের ও বিএনপি চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এদিকে, বিএনপির ঘোষিত তালিকায় গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক সুবর্ণা ঠাকুরের স্থান পাওয়া নিয়ে দলের অভ্যন্তরে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। সুবর্ণা ঠাকুর মতুয়া সম্প্রদায়ের একজন নারী। তিনি ওড়াকান্দি হরিচাঁদ ঠাকুর পরিবারের সদস্য ও পেশায় শিক্ষক।
কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পরের বছর ১ জানুয়ারি কমিটির পূর্ণাজ্ঞ তালিকা প্রকাশ করা হয়। গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জি এম সাহাবুদ্দিন আজম স্বাক্ষরিত ওই তালিকার ২৭ নম্বরে বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে আছে সুবর্ণা ঠাকুরের নাম। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কর্মসূচিতে সুবর্ণা ঠাকুরের উপস্থিতি দেখা গেছে।
এ বিষয়ে দলের একাধিক সিনিয়র নেতা সময়ের আলোকে বলেন, ঘোষিত তালিকায় ভুল ত্রুটি থাকলে দলের নীতিনির্ধারকরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
এএডি/