প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন খুব স্পষ্টভাবে একটি শক্তি-কেন্দ্রিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে মাত্র কয়েকটি দেশ বৈশ্বিক সরবরাহের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০২৪ সালের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে সবচেয়ে বড় গ্যাস উৎপাদক দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে, এবং দ্বিতীয় অবস্থানের দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবধানও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ)-এর পরিসংখ্যান এবং ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩৭,৭৫১ বিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করেছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। শেল গ্যাস বিপ্লব, আধুনিক ড্রিলিং প্রযুক্তি, এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয়ে দেশটি গত এক দশকে উৎপাদনে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে।
বিশ্বজুড়ে গ্যাস বাজার বর্তমানে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরেশিয়া অঞ্চলের সংঘাত এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে অনেক দেশ তুলনামূলক স্থিতিশীল উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
শীর্ষ ১০ গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ (২০২৪) বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. যুক্তরাষ্ট্র – ৩৭,৭৫১ বিলিয়ন ঘনফুট
যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের গ্যাস উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু। শেল রিজার্ভ বিশেষ করে টেক্সাস, পেনসিলভানিয়া ও নিউ মেক্সিকোর বিশাল শেল বেসিন থেকে এই উৎপাদন আসে। দেশটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো শক্তিশালী পাইপলাইন নেটওয়ার্ক, উন্নত প্রযুক্তি এবং দ্রুত এলএনজি (Liquefied Natural Gas) রপ্তানি সক্ষমতা।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানি বাড়িয়েছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইরান-সম্পর্কিত ভূরাজনৈতিক চাপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও স্থিতিশীল সরবরাহকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২. রাশিয়া – ২২,৬৭২ বিলিয়ন ঘনফুট
রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের প্রধান গ্যাস সরবরাহকারী ছিল। দেশটির সাইবেরিয়া অঞ্চলে বিশাল গ্যাস রিজার্ভ রয়েছে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এখন রাশিয়া চীনসহ এশীয় বাজারের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে এবং নতুন পাইপলাইন ও এলএনজি প্রকল্পের মাধ্যমে বিকল্প বাজার তৈরি করার চেষ্টা করছে।
৩. ইরান – ৯,৮৫৩ বিলিয়ন ঘনফুট
ইরান বিশ্বের অন্যতম বড় গ্যাস রিজার্ভের মালিক হলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিদেশি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন ক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। দেশটির গ্যাসের বড় অংশ অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে ব্যবহৃত হয়। রপ্তানি সম্ভাবনা থাকলেও রাজনৈতিক বাধার কারণে তা সীমিত।
৪. চীন – ৯,১১১ বিলিয়ন ঘনফুট
চীন দ্রুত বর্ধনশীল জ্বালানি চাহিদার কারণে একই সঙ্গে উৎপাদক ও বড় আমদানিকারক দেশ। দেশটি অভ্যন্তরীণ শেল গ্যাস ও কোয়াল-বেড মিথেন উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। তবে শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতের বিশাল চাহিদা পূরণে এখনো আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
৫. কানাডা – ৭,০২৮ বিলিয়ন ঘনফুট
কানাডা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান গ্যাস সরবরাহকারী অংশীদার। আলবার্টা ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়া অঞ্চলের বিশাল রিজার্ভ থেকে উৎপাদন আসে। দেশটি এলএনজি রপ্তানি অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এশিয়ার বাজারেও প্রবেশের চেষ্টা করছে।
৬. কাতার – ৬,০০৩ বিলিয়ন ঘনফুট
কাতার বিশ্বব্যাপী এলএনজি বাজারের অন্যতম শীর্ষ খেলোয়াড়। নর্থ ফিল্ড গ্যাসক্ষেত্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গ্যাস রিজার্ভগুলোর একটি। দেশটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ করে। নতুন সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদন ও রপ্তানি ক্ষমতা আরও বাড়ানো হচ্ছে।
৭. অস্ট্রেলিয়া – ৫,৩৬৮ বিলিয়ন ঘনফুট
অস্ট্রেলিয়া এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান এলএনজি রপ্তানিকারক। কুইন্সল্যান্ড ও পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার প্রকল্পগুলো থেকে বড় অংশের উৎপাদন আসে। জাপান ও চীনের মতো দেশগুলো এর প্রধান ক্রেতা।
৮. নরওয়ে – ৪,৬২৬ বিলিয়ন ঘনফুট
নরওয়ে ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম স্তম্ভ। উত্তর সাগরের অফশোর গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত গ্যাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে সরবরাহ করা হয়। রাশিয়ার সরবরাহ কমে যাওয়ার পর নরওয়ের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে।
৯. সৌদি আরব – ৪,৩৪৪ বিলিয়ন ঘনফুট
সৌদি আরব মূলত তেলনির্ভর হলেও এখন গ্যাস খাতে বড় বিনিয়োগ করছে। জাফুরা গ্যাস প্রকল্প বিশ্বের বৃহত্তম শেল গ্যাস উদ্যোগগুলোর একটি। দেশটি গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে নির্ভরতা কমিয়ে তেল রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে চাইছে।
১০. আলজেরিয়া – ৩,৪৯৬ বিলিয়ন ঘনফুট
আলজেরিয়া আফ্রিকার অন্যতম প্রধান গ্যাস উৎপাদক এবং ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। পাইপলাইন ও এলএনজি উভয় মাধ্যমে গ্যাস রপ্তানি করে দেশটি ইউরোপীয় জ্বালানি নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখে, বিশেষ করে দক্ষিণ ইউরোপে।
এই তালিকা থেকে স্পষ্ট, বৈশ্বিক গ্যাস বাজার মূলত কয়েকটি বড় শক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া একসঙ্গে সবচেয়ে বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাদের বাজার ভাগে বড় পরিবর্তন এনেছে। অন্যদিকে কাতার, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো দেশগুলো এলএনজি বাজারে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভবিষ্যতে গ্যাস শুধু জ্বালানি নয়, বরং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি বড় হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করবে।
/ইউএমএইচ