দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশন না থাকায় স্থিমিত রয়েছে সংস্থাটির বিচার কার্যক্রম। গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন, কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ পদত্যাগ করেন। এরপর থেকেই দুদকের বিচার কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। রাঘোব বোয়ালদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ অর্থনৈতিক নানা অনিয়মের অনুসন্ধান অনুমোদন, নতুন মামলা করা, চার্জশিট অনুমোদন, সম্পত্তি ক্রোক এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসহ সব ধরণের কার্যক্রম বন্ধ। এতে করে সংস্থাটির কর্মকর্তাসহ সবাই অলস সময় পার করছেন। অবশ্য, প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ভিন্ন। সরকার কি এখন ২০০৪ সালের আইন অনুযায়ী কমিশন গঠন করবে? নাকি দুদক (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী করবে? এটি সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দুদক সূত্র জানায়, গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগের দেড় ১ মাস পার হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কমিশন গঠনে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি সরকার। কমিশন পদত্যাগ করায় রাষ্ট্রের দুর্নীতিবিরোধী এই প্রতিষ্ঠানটি এখন নেতৃত্ব শূন্য। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে আপাতত দৃষ্টিতে দুদকে অচলাবস্থা কাটাতে কোনো লক্ষণ নেই। সঙ্গত কারণে কবে নাগাদ দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের গতি ফিরবে তাও বলতে পারছেন না সংস্থাটির কর্মকর্তারাও।
আরও পড়ুন
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুদক পরিচালিত হয় ওয়ান ম্যান শো-এ। অর্থাৎ পুরো কমিশন অনুমোদন না দিলে অনুসন্ধান, মামলা অনুমোদন করা সম্ভব হয় না। কমিশন না থাকায় আদালতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার মতো পদক্ষেপও নেওয়া যাচ্ছে না। এতে অভিযুক্তদের আত্মগোপন বা দেশত্যাগের ঝুঁকি তৈরি হয়। পুরো কমিশন নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষায়। দ্রুত সময়ের মধ্যে কমিশন নিয়োগ না দিলে দুদকের অচলাবস্থা কাটবে না।
দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন বলেন, কমিশন ছাড়া দুদক আইনে নির্ধারিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে কার্যক্রমে একধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কমিশন থাকার সময় যেসব অনুসন্ধান ও তদন্ত অনুমোদিত হয়েছিল, সেগুলো সীমিত পরিসরে চলমান। যত দ্রুত দুদকের কমিশন গঠন হবে, ততই কাজের গতি বাড়বে। যেহেতু দুদক আইন ও বিধিতে কমিশনের অবর্তমানে কার্যক্রম পরিচালনার কোন ধরনের আইনি সুযোগও রাখা হয়নি। তবে অভিযোগ গ্রহণ, যাচাই-বাছাই, অনুসন্ধান-তদন্ত কার্যক্রম, আদালতের বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদকের কমিশনকে পদত্যাগে বাধ্য করার সহজ কাজটি সরকার করতে পেরেছে। শুধু দুদকেই নয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, মানবাধিকার কমিশন, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোসহ সব জায়গায় ঊর্ধ্বতনদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে সরকার। যদি বিএনপি সরকারের ইশতেহারের অঙ্গিকারে দুর্নীতি দমনের বিষয়টি আছে। তবে দেশবাসীর কাছে একটা বার্তা যাচ্ছে, বিএনপি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ এখনও নেয়নি। যা তাদের ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিগত কমিশনের বিদায়ে দুদকে যে শূন্যতা ও স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণে অবিলম্বে নতুন কমিশন গঠন করতে হবে। আসলে এখানে সরকারই জটিল করে তুলেছে। এখন সরকার কি ২০০৪ সালের আইনে কমিশন গঠন করবে? নাকি দুদকের নতুন দুদক (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী করবে, সেখানেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তারা এখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। দুদক এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে কমিশন না থাকলে কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। হয়তো পুরানো কোনো অনুসন্ধানের অনুমোদন থাকলে সেই কাজগুলো করতে পারে। এর বাইরে দুদক এখন অলস পড়ে আছে। অফিসে আসা যাওয়া ছাড়া আর কিছু নেই। সেক্ষেত্রে সরকারকে দ্রুত সময়ের মধ্যে এই উদ্যোগ নিতে হবে। সার্চ কমিটি বা পর্যবেক্ষক কমিটি গঠন করে রাষ্ট্রপতির নির্দেশক্রমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে অভিযুক্তরা সুযোগ পেয়ে যাবেন। পাশাপাশি হঠাৎ করে কাজের চাপ বেড়ে যাবে সংস্থাটির।
এদিকে, ২০০৪ সালের আইন অনুযায়ী, দুদক কমিশন তিন জন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত হইবে এবং তাহাদের মধ্য হইতে রাষ্ট্রপতি একজনকে চেয়ারম্যান নিয়োগ করিবেন। কমিশনারগণ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ধারা ৭ অনুসারে গঠিত বাছাই কমিটির সুপারিশ ক্রমে নিয়োগপ্রাপ্ত হইবেন। কমিশনারগণ পূর্ণকালীন সময়ের জন্য স্ব-স্ব পদে কর্মরত থাকিবেন। কমিশনারগণ, ধারা ১০ এর বিধান সাপেক্ষে, তাঁহাদের নিয়োগের তারিখ হইতে চার বৎসর মেয়াদের জন্য স্ব-স্ব পদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন। পাঁচ জন সদস্য সমন্বয়ে একটি বাছাই কমিটি গঠিত হইবে। যেখানে প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের একজন বিচারক, প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারী কর্ম-কমিশনের চেয়ারম্যান এবং অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিবদের মধ্যে সর্বশেষে অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব। প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের বিচারক বাছাই কমিটির সভাপতি হইবেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বাছাই কমিটির কার্য-সম্পাদনে প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা প্রদান করিবে। বাছাই কমিটি, কমিশনার নিয়োগে সুপারিশ প্রদানের উদ্দেশ্যে, উপস্থিত সদস্যদের ৩ জনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কমিশনারের প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুই জন ব্যক্তির নামের তালিকা প্রণয়ন করিয়া ধারা ৬ এর অধীন নিয়োগ প্রদানের জন্য রাষ্ট্রপতির নিকট প্রেরণ করিবে। ৪ জন সদস্যের উপস্থিতিতে বাছাই কমিটির কোরাম গঠিত হইবে।
অপরদিকে, দুদকের নতুন দুদক (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী, সার্চ কমিটির পরিবর্তে বাছাই ও পর্যবেক্ষক কমিটির মাধ্যমে নতুন কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। নতুন কাঠামোতে ৫ সদস্যের এই কমিটি কমিশন বাছাই করে দেবে। এছাড়া, সার্চ কমিটি ছাড়াই নতুন কমিশনার নিয়োগের বিশেষ সুযোগ রয়েছে। নতুন কাঠামোয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ৫ সদস্যের কমিশনে রূপান্তরিত হচ্ছে। এখানে ১ জন নারী এবং ১ জন আইসিটি বিশেষজ্ঞ থাকা বাধ্যতামূলক। বাছাই ও পর্যবেক্ষক কমিটির প্রধান হবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন সিনিয়র বিচারক। এছাড়া হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সদ্যবিদায়ী সচিব ও সরকারি কর্ম-কমিশনের চেয়ারম্যান। এই ৫ সদস্যের কমিটি আলোচনা করে শীর্ষ তিনটি পদের জন্য ছয় জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেবে। রাষ্ট্রপতি ওই তালিকা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কমিশনার হিসেবে তিনজনকে নির্বাচিত করবেন। তাদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেবেন। এছাড়া নতুন অধ্যাদেশে অনুসন্ধান ছাড়াই সরাসরি মামলা (এফআইআর) দায়ের করার ক্ষমতা পেয়েছে দুদক।
একই সঙ্গে নতুন কমিশনে কাজ করার সময় কমিয়ে ৪ বছর করা হয়েছে এবং দুদকের কার্যক্রম প্রতি ৬ মাস পরপর ওয়েবসাইটে প্রকাশের বিধান রাখা হয়েছে। অবশ্য, দুদকের নতুন দুদক (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী, সার্চ কমিটির পরিবর্তে বাছাই ও পর্যবেক্ষক কমিটির মাধ্যমে নতুন কমিশন গঠনের বিধান রাখা হলেও এখনও কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার।
এদিকে, ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত সাতটি কমিশন দুদকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এরমধ্যে চারটি কমিশনকেই চার বছরের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বিদায় নিতে হয়েছে। সাবেক বিচারপতি প্রয়াত সুলতান হোসেন খানের নেতৃত্বে কমিশন দায়িত্ব পালন করেছেন ২ বছর তিন মাস। লে. জে: (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিশন দুই বছর দায়িত্বে ছিলেন। সরকারের সাবেক সচিব গোলাম রহমান, সরকারের সাবেক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা মো. বদিউজ্জামান ও সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন যথারীতি তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ করেছেন। সরকারের সাবেক সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ তিন বছর ছয় মাস ও ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন এক বছর এক মাস দায়িত্ব পালন করে। অবশ্য, চলতি বছরের গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি। দলটি সরকার গঠনের দুই সপ্তাহ পরই পদত্যাগ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর ড. মোমেনকে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। একই সময়ে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সাবেক জেলা জজ মিঞা মুহাম্মদ আলী আকবার আজিজী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদকে। পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া এই কমিশন নিজেদের মেয়াদের মাত্র এক বছর দুই মাস দায়িত্ব পালন শেষে গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করেন।
দুদকে নতুন কমিশনে আলোচনায় যারা : দুদকে নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার হিসেবে কারা আসছেন তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এরমধ্যে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ঢাকা মহানগর আদালতের সাবেক সিনিয়র স্পেশাল জজ মোতাহার হোসেনের নাম শোনা যাচ্ছে। বিদেশে অর্থপাচার সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন বিচারক মোতাহার হোসেন। সে সময় তিনি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এর বিচারক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওই বছরের ডিসেম্বরে তিনি অবসরে যান। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাত হোসেন ভূঁইয়া, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইয়া, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, পুলিশের সাবেক আইজিপি শহুদুল হক, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর আপন ভাই প্রশাসন ক্যাডারের ৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়কার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব এ এইচ এম নুরুল ইসলামের নাম শোনা যাচ্ছে।
এএডি/