এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা আজ শুরু হচ্ছে। দেশের ১৮ লাখ ৫৭ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষার মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে তত্ত্বীয় পরীক্ষা চলবে ২০ মে পর্যন্ত। এরপর ৭ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত হবে ব্যবহারিক পরীক্ষা। দাখিল পরীক্ষা শুরু হবে কুরআন মাজিদ ও তাজভীদ বিষয়ের পরীক্ষা দিয়ে। ২৪ মে পর্যন্ত দাখিলের তত্ত্বীয় পরীক্ষা চলবে। আর ৭ থেকে ১৪ জুনের মধ্যে ব্যবহারিক পরীক্ষা হবে। এদিন ভোকেশনালের শিক্ষার্থীরা দেবেন বাংলা-২ বিষয়ের পরীক্ষা। ১৪ মে তাদের তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হবে। ১৭ থেকে ২১ মে তাদের ব্যবহারিক পরীক্ষা ও ১ থেকে ১৮ জুন ‘বাস্তব প্রশিক্ষণ’ অনুষ্ঠিত হবে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটিই প্রথম পাবলিক পরীক্ষা। শিক্ষা বোর্ডগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ পরীক্ষা সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে অনুষ্ঠানে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
নির্ধারিত দিনে সকাল ১০টা থেকে এসব পরীক্ষা শুরু হলেও পরীক্ষার্থীদের ৩০ মিনিট আগে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। ৯টি সাধারণ ধারার শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন শিক্ষার্থী।
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেবে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও দাখিল ভোকেশনাল পরীক্ষায় বসছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন পরীক্ষার্থী। এবার ৭৯ হাজার ২৩৫ পরীক্ষার্থী কমেছে। সব মিলিয়ে এবার মোট পরীক্ষার্থী ১৮ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি। গত বছর মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৯ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি। পরীক্ষার্থীদের তথ্য পর্যালোচনায় আরও একটি নেতিবাচক বিষয় উঠে এসেছে। দুই বছর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করেও তাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর সূত্র জানিয়েছে, এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২ বছর আগে (২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ) নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেছিল ১৩ লাখ ৩৪ হাজার ৩৩৩ জন। এর মধ্যে এবারের এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ফরম পূরণ করেছে ১১ লাখ পাঁচ হাজারের বেশি। এ তথ্য বলছে, ২ বছরের ব্যবধানে ২ লাখ ২৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষা দিচ্ছে না। তারা হয় ঝরে গেছে, না হয় আগের ক্লাস রয়ে গেছে।
মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২ বছর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেছিল ৩ লাখ ৭৮ হাজারের মতো শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পরীক্ষা দিচ্ছে ২ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি। আর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন ২ বছর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেছিল প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পরীক্ষা দিচ্ছে এক লাখ ছয় হাজারের বেশি।
এবার অনিয়মিত পরীক্ষার্থী চার লাখের বেশি। তাদের মধ্যে এক বিষয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে ২ লাখ ৬১ হাজারের বেশি। বাকিরা দুই, তিন, চার বা সব বিষয়ে আবারও পরীক্ষা দিচ্ছে।
এবার নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষার্থী ১৪ লাখ ১৮ হাজারের বেশি, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৩ লাখের বেশি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী ১ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি। মোট ৩ হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা।
এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র করে প্রশ্নফাঁস ও নকল প্রতিরোধে নজিরবিহীন কড়াকড়ি আরোপ করেছে সরকার। সাইবার অপরাধ ঠেকাতে জোরদার করা হয়েছে অনলাইন মনিটরিং, গঠন করা হয়েছে বিশেষ মনিটরিং সেল। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) যুক্ত করে চালু করা হয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, যাতে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সোমবার চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, প্রশ্নফাঁস ও অনিয়ম ঠেকাতে সাইবার অপরাধের দিকেও বিশেষ নজরদারি করা হচ্ছে। প্রশ্নপত্র থানা থেকে যারা গ্রহণ করেন, তাদের তালিকা সংগ্রহ করে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম ঘটলে তা দ্রুত শনাক্ত করা যায়। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও চালু করা হয়েছে, যেখানে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) যুক্ত আছেন।
প্রশ্নফাঁস প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও বিতরণব্যবস্থার অনেক কিছুই পূর্ববর্তী সরকারের সময় নির্ধারিত ছিল, বর্তমান সরকার মূলত পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। তবে প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা সচল আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, পাবলিক পরীক্ষা আইন ১৯৮০ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এতে ডিজিটাল অপরাধের বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে। সংশোধিত আইনটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষার আওতা ও কাঠামোতেও কিছু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ রয়েছে।
খাতা মূল্যায়নের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরীক্ষকদের যথেষ্ট সময় দিয়ে খাতা দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মূল্যায়ন পদ্ধতি সঠিকভাবে অনুসরণ হচ্ছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে ‘মানবিক নম্বর’ দেওয়ার জন্য কোনো ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলে স্পষ্ট করেন তিনি।
কোচিং সেন্টার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, শ্রেণিকক্ষে যথাযথ পাঠদান না হলে শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তবে কোচিং সেন্টারগুলোর কোনো সরকারি নিবন্ধন বা তালিকা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিনি জানান, এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগও করা হয়েছে। এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ব্যবহারিক অংশে স্বচ্ছতা ফেরাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা। বিগত বছরগুলোতে ব্যবহারিক পরীক্ষায় শৈথিল্য প্রদর্শন বা ‘গড়পড়তা’ নম্বর দেওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা বন্ধ করতে এবার কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে পরীক্ষায় অংশ নিয়েই নম্বর অর্জন করতে হবে।
কেন্দ্র সচিবদের জানানো হয়েছে, তাত্ত্বিক পরীক্ষা যে কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে, ব্যবহারিক পরীক্ষাও সেই কেন্দ্রেই নিতে হবে। এ ছাড়া স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পরীক্ষক নিয়োগে আনা হয়েছে আমূল পরিবর্তন। কোনোভাবেই নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষককে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য ‘বহিরাগত পরীক্ষক’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাত দিনের মধ্যে উত্তরপত্র ও নম্বর ফর্দ ডাকযোগে না পাঠিয়ে সরাসরি বোর্ডে এসে হাতে হাতে জমা দিতে হবে।
এই নিয়মে অবহেলা করলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত করাসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার হলে নকলের সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর করা হচ্ছে। এর আওতায় ২০টি সুনির্দিষ্ট অপরাধের তালিকা করে শাস্তিকে তিন স্তরে ভাগ করা হয়েছে।
পরীক্ষা কক্ষে কথা বলা, ডেস্কে বা পোশাকে কোনো কিছু লেখা থাকা, ক্যালকুলেটরে তথ্য লুকিয়ে রাখা কিংবা মোবাইল বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস সঙ্গে রাখলে এ বছরের পরীক্ষা বাতিল করা হবে। যদি কোনো পরীক্ষার্থী প্রশ্ন বা উত্তরপত্র হলের বাইরে পাচার করে, কক্ষ পর্যবেক্ষককে হুমকি প্রদান করে কিংবা উত্তরপত্র জমা না দিয়ে হল ত্যাগ করে, তবে তার ওই বছরের পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী এক বছরের জন্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হবে।
অন্যের হয়ে পরীক্ষা দেওয়া (প্রক্সি), রোল বা রেজিস্ট্রেশন নম্বর ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করা, উত্তরপত্র বিনিময় করা এবং কেন্দ্রসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের শারীরিকভাবে আক্রমণ কিংবা অস্ত্রের প্রদর্শন করার মতো ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীকে সরাসরি দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হবে। একই সঙ্গে এসব গুরুতর অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং নিয়মিত ফৌজদারি মামলা করা হবে।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রকাশিত নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এবারের এসএসসি পরীক্ষায় সময় বিভাজনে নতুন নিয়ম কার্যকর হতে যাচ্ছে। এখন থেকে সৃজনশীল (সিকিউ) ও বহুনির্বাচনি (এমসিকিউ) পরীক্ষার মধ্যে কোনো বিরতি থাকবে না। ১০০ নম্বরের পরীক্ষার ক্ষেত্রে ৩০ নম্বরের এমসিকিউয়ের জন্য ৩০ মিনিট এবং ৭০ নম্বরের সৃজনশীল অংশের জন্য ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে ব্যবহারিক আছে এমন বিষয়গুলোতে ২৫ নম্বরের এমসিকিউয়ের জন্য ২৫ মিনিট এবং ৫০ নম্বরের সৃজনশীলের জন্য শিক্ষার্থীরা ২ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট সময় পাবে। এ ছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, অটিস্টিক বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের চেয়ে অতিরিক্ত ৪৫ মিনিট সময় বেশি পাবেন এবং নিয়ম অনুযায়ী তারা চাইলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শ্রুতিলেখক সঙ্গে রাখতে পারবেন।
পরীক্ষার হলে নকলমুক্ত পরিবেশ ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আসন বিন্যাসেও আনা হয়েছে আমূল পরিবর্তন। বোর্ডের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ৫ থেকে ৬ ফুট লম্বা প্রতি বেঞ্চে সর্বোচ্চ ২ জন এবং ৪ ফুট লম্বা বেঞ্চে মাত্র ১ জন পরীক্ষার্থী বসতে পারবে। একই বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের পরস্পরের কাছাকাছি আসন বরাদ্দ দেওয়া যাবে না এবং কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নিজস্ব কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে পারবে না। এ ছাড়া হলে সুষ্ঠু তদারকির জন্য প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে একজন করে কক্ষ পর্যবেক্ষক রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।