গরমে স্বস্তির খোঁজে

নিবেদিতা দাস

ফিচার

গ্রীষ্ম এলেই শহরের চেহারা যেন বদলে যায়। দুপুরের রোদে পিচঢালা রাস্তা ঝিলমিল করে, উঁচু কংক্রিটের দালানগুলো তাপ জমিয়ে রাখে, আর

2026-04-21T02:24:27+00:00
2026-04-21T02:24:27+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ফিচার
গরমে স্বস্তির খোঁজে
নিবেদিতা দাস
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ২:২৪ এএম 
সংগৃহীত ছবি
গ্রীষ্ম এলেই শহরের চেহারা যেন বদলে যায়। দুপুরের রোদে পিচঢালা রাস্তা ঝিলমিল করে, উঁচু কংক্রিটের দালানগুলো তাপ জমিয়ে রাখে, আর বাতাস হয়ে ওঠে ভারী ও ক্লান্তিকর, গাড়ির ধোঁয়া আর নিরবচ্ছিন্ন শব্দ সব মিলিয়ে যেন তাপঘরে বন্দি এক অদৃশ্য জীবন। শহুরে জীবনের ব্যস্ততার সঙ্গে এই তীব্র গরম যোগ হয়ে তৈরি করে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। 

এই তীব্র গরমে বাইরের পৃথিবীটা যখন দহনশালা, তখন দিনশেষে নিজের ঘরটিই হওয়া চাই শান্তির। আপনার প্রিয় ঘরটিকে এই গরমেও কীভাবে শীতল ও আরামদায়ক রাখা যায়, তা নিয়েই আজকের বিশেষ ফিচার।

ঘরের ভেতরে স্বস্তির পরিবেশ

এই গরমের মধ্যেও সবাই খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে স্বস্তির পথ। অনেকেই ঘরের ভেতর পরিবেশকে আরামদায়ক রাখতে ছোট ছোট পরিবর্তন এনে ঘরকে রাখে শীতল ও আরামদায়ক।

রঙের ব্যবহার ও ফেব্রিকের জাদু

গরমের দিনে ঘরের পরিবেশ শান্ত রাখতে রঙের ভূমিকা অপরিসীম। মনে রাখবেন, গাঢ় রং তাপ শোষণ করে ঘরকে তপ্ত করে তোলে, আর হালকা রং তাপ প্রতিফলিত করে ঘরকে রাখে স্নিগ্ধ।

হালকা রঙের চাদর ও পর্দা : ঘরে সাদা, আকাশি, হালকা সবুজ বা প্যাস্টেল রঙের সুতি ও লিনেন কাপড় ব্যবহার করুন। এটি শুধু চোখের আরামই দেয় না, ঘরকে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। 

দেয়ালে রঙের ব্যবহার : মনে রাখবেন, রং যত গাঢ় হয়, তত আলো শোষিত হয় এবং যত হালকা হয়, তত আলো বেশি প্রতিফলিত হয়। ঘরে যতবেশি আলো শোষিত হয়, তত তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। তাই ঘরের ভেতর যতটা সম্ভব হালকা রং ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। এতে করে দিনের বেলা ঘর তাপ ধরে রাখবে না। ফলে আলো চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘর ঠান্ডা হতে শুরু করবে।

দিনের বেলায় পর্দার শাসন : ঘড়ির কাঁটা বেলা ১১টা পেরোলেই জানালার পর্দা টেনে দিন, বিশেষ করে যেদিকে রোদের তেজ বেশি। ভারী সুতির পর্দা সূর্যের তাপ ঢুকতে বাধা দেবে। বিকাল গড়িয়ে সূর্য ডুবলে জানালা খুলে দিন, যাতে গুমোট ভাব কেটে বাইরের হাওয়া খেলতে পারে।

ইনডোর প্লান্ট : ঘরের ভেতর এক চিলতে বাগান শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি প্রাকৃতিক এয়ার কন্ডিশনার হিসেবেও কাজ করে। ঘরের মধ্যে গাছ রাখলে তা তাপ শুষে নেয়। মানিপ্লান্ট, অ্যালোভেরা, স্নেক প্লান্ট, অ্যারিকা পাম ঘরে রাখলে দেখতে যেমন সুন্দর লাগে তেমনি ঘরের পরিবেশও হয়ে উঠবে আরামদায়ক। এগুলো বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নিয়ে ঘরকে প্রাকৃতিকভাবে শীতল রাখে।

ইন্টেরিয়র ডিজাইনার মো. আবু হুরায়রা জুয়েল বলেন, ঘরের ভেতর সবুজ গাছ রাখা এখন শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং প্রয়োজন। প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবস্থা এবং ভারী ফার্নিচার কম ব্যবহার করলে ঘর অনেকটা ঠান্ডা থাকে। ছাদ বা বারান্দায় ছোট বাগান তৈরি করাও কার্যকর একটি উপায়। অত্যধিক গরমে বাসার ভেতরের পরিবেশ কিছুটা শীতল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাছ ঘরের তাপমাত্রা কিছুটা কমাতে সাহায্য করে এবং বাতাসও সতেজ রাখে।

আলো ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রের পরিমিত ব্যবহার

অনেকেই শখের বসে ঘরে নানারকম উজ্জ্বল আলো ব্যবহার করেন, যা অজান্তেই ঘরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

অতিরিক্ত আলো পরিহার : দিনের বেলা যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক আলোতে কাজ সারুন। রাতেও খুব বেশি প্রয়োজন না হলে বাড়তি আলো জ্বালাবেন না।

চার্জার ও গেজেট : কাজ শেষে মোবাইল চার্জার, ল্যাপটপ বা অন্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রের সুইচ বন্ধ রাখুন। ছোট এই যন্ত্রগুলোও ক্ষুদ্র মাত্রায় তাপ উৎপন্ন করে যা ঘরের গুমোট ভাব বাড়ায়।

রান্নাঘরের যত্ন : রান্নার সময় অবশ্যই অ্যাডজাস্ট ফ্যান চালু রাখুন, যাতে আগুনের উত্তাপ দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। রান্না শেষে অহেতুক চুলা জ্বালিয়ে রাখবেন না।

মানসিক প্রশান্তি

দিনের শেষে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে গোসলের পানিতে কয়েক ফোঁটা এসেনসিয়াল অয়েল বা লেবুর রস মিশিয়ে নিতে পারেন। এটি শরীরকে শিথিল করবে। সুযোগ থাকলে ঘরের কোণে ছোট একটি মাটির পাত্রে পানি ও কিছু ফুল সাজিয়ে রাখুন, যা মনকে শীতলতার আমেজ দেবে।

নগর পরিকল্পনায় শীতলতার ভাবনা

শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগই নয়, শহরের সামগ্রিক পরিকল্পনাতেও শীতলতা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে। নগর পরিকল্পনায় সবুজায়ন বাড়ানো, খোলা জায়গা সংরক্ষণ, জলাধার রক্ষা এসব বিষয় গুরুত্ব পেলে শহরের তাপমাত্রা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ছাদবাগান, উল্লম্ব বাগান বা গ্রিন বিল্ডিং ধারণাগুলো এখন ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের শহরকে আরও বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।

স্থপতি ইশরাত জাহান মনে করেন, নগর পরিকল্পনায় সবুজায়ন বাড়ানো, জলাধার সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। কুল রুফ প্রযুক্তি, যেখানে ছাদে তাপ প্রতিরোধী উপকরণ ব্যবহার করা হয়, তা শহরের তাপমাত্রা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন ভবন নির্মাণের সময় এই বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক করা উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শহরের ভেতরে সবুজের স্পেস তৈরি করা। পার্ক, খেলার মাঠ, জলাধার এসব শুধু বিনোদনের জন্য নয়, বরং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নগরায়ণের চাপে এসব জায়গা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। ফলে শহর আরও বেশি গরম হয়ে উঠছে। পরিকল্পিত নগরায়ণে এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া না হলে ভবিষ্যতে শহর আরও বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।

এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী আমরা সবাই। তাই সমাধানও আসতে হবে সম্মিলিত উদ্যোগে। বাসার সামনে একটি গাছ লাগানো থেকে শুরু করে বড় পরিসরে নগর পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব চিন্তা যুক্ত করা সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সচেতনতা তৈরি করাও জরুরি, যাতে মানুষ বুঝতে পারে এই সমস্যা শুধু অস্বস্তির নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। 

গরমে স্বস্তি খোঁজার বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত আরামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশও।
সব মিলিয়ে কংক্রিটের শহরে শীতলতা খোঁজা যেন এক ধরনের দৈনন্দিন সংগ্রাম। তবু এই সংগ্রামের মাঝেই মানুষ খুঁজে নেয় ছোট ছোট আনন্দ, সামান্য স্বস্তি। ব্যক্তিগত ও সামাজিক উদ্যোগ মিলেই ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে আরও সহনীয়, আরও মানবিক এক নগরজীবন।



  বিষয়:   গ্রীষ্ম  গরম  ঘর  স্বস্তি  পরিবেশ 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: