স্বাস্থ্যসেবা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাস্তবে দেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই অধিকার আজও অধরাই রয়ে গেছে। তেমনই একটি এলাকা পাবনার বেড়া উপজেলার যমুনা, ইছামতী, হুড়াসাগর নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চল। এসব এলাকার প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। উপজেলার ১৫-২০টি চরে বসবাসকারী মানুষের জন্য নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। পাঁচটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও তার মধ্যে দুটি ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বাকি কেন্দ্রগুলোতেও নেই পর্যাপ্ত ওষুধ এবং নিয়মিত চিকিৎসক। ফলে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু কিংবা অপচিকিৎসার শিকার হওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে চরাঞ্চলের এসব প্রান্তিক জনপদে। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে স্থানীয় ফার্মেসি ও অনভিজ্ঞ চিকিৎসক চরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে নদী পার করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মৃত্যু ঘটে। বাধ্য হয়ে অনেকে ঝাড়ফুঁকের মতো অপ্রচলিত কুসংস্কার পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার হাটুরিয়া-নাকালিয়া, নতুন ভারেঙ্গা ও পুরান ভারেঙ্গা ইউনিয়নের চর নাগদাহ, চর পেচাকোলা, চর সাঁড়াশিয়া, চর নাকালিয়া, চরসাফুল্লা, ঘিউর, হাটাইল আড়ালিয়া চর পাইখন্দ, বেঙ্গালিয়া, চরকল্যাণপুর, খড়বাগানসহ বিভিন্ন চর এলাকায় প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের বসবাস। চরাঞ্চল মানুষের একমাত্র যোগাযোগমাধ্যম নদীপথ। অধিকাংশ বাসিন্দা জেলে ও কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে তারা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যে কয়েকটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে, সেখানেও প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসক নেই বললেই চলে। জরুরি রোগীদের বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা পার্শ্ববর্তী সাঁথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুরের বেসরকারি ক্লিনিকে নিতে হয়। তবে নদীর প্রতিকূল স্রোত, নৌযানের স্বল্পতা এবং রাতের আঁধারে রোগী পরিবহন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ২০১৩ সালে চরাঞ্চলের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স (ক্লিনিক বোট) সরবরাহ করা হলেও সেটি এখনও চালু করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এটি অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
চরাঞ্চলে বসবাস করা মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা। গর্ভকালীন পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব ও নবজাতকের চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় অনেক নারী ঝুঁকি নিয়ে ঘরেই সন্তান প্রসব করছেন। এতে মা ও নবজাতকের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, ডায়রিয়া ও জ্বরের প্রকোপও বাড়ছে।
চর সাঁড়াশিয়া গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক আমজাদ হোসেন বলেন, চরাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে। ওষুধ পাওয়া তো দূরের কথা গুরুতর রোগী হলে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যায় না।
চর নাকালিয়া গ্রামের হাজি ইসমাইল মাস্টার জানান, কত সরকার আসে যায়, কিন্তু চরাঞ্চলের মানুষের দুঃখ দূর হয় না! রাতে মা-বোনরা প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করলে যাতায়াত ব্যবস্থা এবং চিকিৎসাসেবা ঠিকঠাক মতো না থাকায় তাদের নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
চর নাগদাহ গ্রামের স্থানীয় ইউপি সদস্য জাহিদ মোল্লা জানান, চর নাগদাহ গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিকটি প্রায় দুই বছর আগে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। স্বল্পমাত্রায় চিকিৎসাসেবা চালু রাখতে আমাদের গ্রামবাসীদের নিজস্ব অর্থায়নে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া ক্লিনিকটি চর সাঁড়াশিয়া গ্রামে স্থানীয়ভাবে টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হলেও সেখানে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় না। তবে সপ্তাহে দুদিন সোম এবং বৃহস্পতিবার ওষুধ বিতরণ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ক্লিনিকটি সরকারিভাবে দ্রুত নির্মাণ করা জরুরি। নদীগর্ভে বিলীন হওয়া কমিউনিটি ক্লিনিকটি যদি সরকারিভাবে ইট-পাথর দিয়ে নির্মাণ করা সম্ভব না হয়, তা হলে দ্রুতগতিতে অন্তত আধাপাকা করে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল হামিদ সরকার জানান, তার ইউনিয়নে চরাঞ্চলে দুটি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে একটি নদী ভাঙনে হারিয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, নতুন করে কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের জন্য ইউএনওর সঙ্গে কথা বলেছি, আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে জানার জন্য বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাহমিনা সুলতানা নীলার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, চরাঞ্চলে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সত্যি অত্যন্ত কষ্টকর। এসব এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবার যাতে সুফল ঘটে সে বিষয়ে দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।