গাজার ২য় রণাঙ্গন রোগবাহী ধাড়ি ইঁদুর

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

গাজার অস্বাস্থ্যকর শরণার্থী শিবিরগুলোতে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর কাছে এখন এক নতুন আতঙ্কের নাম ইঁদুর। যুদ্ধের ভয়াবহতার পাশাপাশি এই রোগবাহী প্রাণীদের উপদ্রবে

2026-04-24T06:59:03+00:00
2026-04-24T06:59:03+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬,
২৩ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
গাজার ২য় রণাঙ্গন রোগবাহী ধাড়ি ইঁদুর
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:৫৯ এএম 
গাজা শহরে ধ্বংসস্তূপের মাঝে সামাহ ও তার পরিবার কোনোমতে তাঁবুতে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। তবে আশ্রয়স্থলটিতে পরিবারটির প্রতিদিনকার আতঙ্ক বড় বড় ইঁদুর। ছবি : আলজাজিরা
গাজার অস্বাস্থ্যকর শরণার্থী শিবিরগুলোতে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর কাছে এখন এক নতুন আতঙ্কের নাম ইঁদুর। যুদ্ধের ভয়াবহতার পাশাপাশি এই রোগবাহী প্রাণীদের উপদ্রবে তাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। একদিকে প্রতিনিয়ত ইসরাইলি আক্রমণ আর অন্যদিকে এই মহামারি সৃষ্টিকারী উপদ্রব। সব মিলিয়ে গাজাবাসীর জন্য পরিস্থিতি অসহনীয় হলেও এই বিপদ থেকে উদ্ধারে সাহায্য পাওয়ার ক্ষীণ আশাও নেই তাদের মনে।

আলজাজিরার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় ধ্বংসস্তূপ জমে সৃষ্টি হওয়া এক পাহাড়ের পাশে একটি অস্থায়ী তাঁবুতে সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছেন সামাহ আল-দাবলা। এখন এক নতুন আতঙ্ক তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আর তা হলো তাঁবু দখল করে নেওয়া ইঁদুরের দল। যুদ্ধের আগে এমন আতঙ্কের সঙ্গে তাদের পরিচয় ছিল না। তিন বছরের মায়াসিন আর চার বছরের আসাদকে সামাহ কখনো চোখের আড়াল করতে পারেন না। ইঁদুর তাড়াতে মরিয়া হয়ে দিনের বেশিরভাগ সময় পরিষ্কার করেই কাটিয়ে দেন কিন্তু কোনো লাভ হয় না।

এক সপ্তাহ আগে, মধ্যরাতে সামাহর ঘুম ভেঙে যায় মায়াসিনের ‘চোর, চোর’ চিৎকারে। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেননি সামাহ। তারপর মেয়েকে কোলে তুলতেই হাতে রক্ত লেগে যায়। তার বাবা টর্চ জ্বালাতেই দেখেন, তাঁবুর ভেতর ইঁদুর ছুটছে...বিশাল, যেন একটা খরগোশ। 

বাবা-মা বুঝতে পারেন, প্রাণীটা মায়াসিনের গায়ে কামড় বসিয়েছে; হাত কেটে রক্ত পড়ছে, বিছানাও রক্তে ভিজে গেছে। স্থানীয় ক্লিনিক তার চিকিৎসা করতে পারেনি, তাই তাকে নিতে হয় মধ্য গাজার আল-শিফা হাসপাতালে। চিকিৎসা পেলেও শিশুটি ঘটনার আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেনি এখনও।

সামাহ বলেন, সে খুব ভীত হয়ে পড়েছে। প্রতি রাতে আমার বুকে ঘুমাতে চায়। হঠাৎ হঠাৎ ভয়ে জেগে ওঠে, আশপাশে ইঁদুরের শব্দ শুনতে পেলে আঁতকে ওঠে। সামাহ নিজেও ঘুমাতে পারেন না, আবার এমন ঘটনা ঘটার ভয়ে। সামাহ বলেন, তার ধারণা, ইঁদুরগুলো আরও আগ্রাসী হয়ে উঠেছে কারণ ওরা ‘ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষের দেহ খেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে’। গাজায় ইসরাইল বাহিনী ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে।

সামাহ আলজাজিরাকে বলেন, পরিস্থিতি খুবই আতঙ্কের...ইঁদুর আর ছোট ইঁদুর সব জায়গায়। তিনি সামনের ধ্বংসস্তূপ দেখিয়ে বলেন, সেসব গর্তে ইঁদুররা বাসা বেঁধেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই আমার আতঙ্ক লাগে, কারণ ইঁদুরের দল এক ভয়ংকর রূপে ছড়িয়ে পড়ে, ক্লান্ত গলায় যোগ করেন তিনি। কাল রাতে তাঁবুতে ফিরে দেখি, পাশে ওই ধ্বংসস্তূপের টিলার ওপর সব ইঁদুরে ভরা...ভয়াবহ দৃশ্য, কোনো মানুষ তা কল্প-নাও করতে পারে না।

ইঁদুরের অভয়ারণ্য : গাজায় ইসরাইলি আক্রমণ আর জোরপূর্বক উচ্ছেদে জেরে নিজেদের ঘর থেকে উৎখাত হয়ে বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ মানুষ তাঁবুতে বসবাস করছে। অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও পুনর্গঠনের কোনো চিহ্ন এখনও দেখা যাচ্ছে না। তাই তাদের যেমন পরিস্থিতি, তেমনভাবেই দিন কাটাতে হচ্ছে।

এর অর্থ হলো বিশুদ্ধ পানি জোগাড় করা, বিদ্যুৎ-ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করা, খাবার খোঁজা, আর রোগ-জীবাণুর বাহক ইঁদুরের মতো প্রাণী ও পোকা-মাকড় মোকাবিলা করা। কারণ গ্রীষ্ম আসতে আসতে সমস্যা কেবল বাড়ছেই। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত সামাহ ইঁদুর মারার বিষ কেনার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু দাম এত বেশি যে তা সম্ভব হয়নি। কারণ পরিবারের খাবার জোগাড় করতেই তাদের নাভিশ্বাস ওঠে।

যুদ্ধের আগে তার স্বামী স্ট্রবেরি ক্ষেতে কাজ করতেন। তখন তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। এখন সংসারে আয় পুরোপুরি বন্ধ, খাবার জোগাড়ই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। মুশকিল হলো, সংসারের জন্য যেটুকু খাবার আনেন, তাতেও ইঁদুররা ভাগ বসায়।

যুদ্ধের আগে এমন আতঙ্কের সঙ্গে তাসামাহ আক্ষেপ করে বলেন, কমিউনিটি কিচেন থেকে খাবার এনে ঢেকে রাখি, কিছুক্ষণ পর এসে দেখি তাতে ইঁদুরের বিষ্ঠা। সব ফেলে দিতে হয়। ওরা আমাদের আটার ব্যাগ, জামাকাপড়, এমনকি তাঁবুর কোণ পর্যন্ত খেয়ে ফেলেছে।


মরিয়া হয়ে চারপাশ পরিষ্কার করেও সামাহর আর্তনাদ, ইঁদুর আসছেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সমস্যাটা সর্বজনীন, শুধু তার তাঁবুতেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি আরও জানান, আশপাশের মানুষজন ব্যক্তিগতভাবে ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করলে ইঁদুররা আরও ছড়িয়ে পড়ে। আমার চারপাশের সবাই এ যন্ত্রণায় ভুগছে...প্রতিবেশী, আত্মীয়– সবাই ইঁদুরের জ¦ালায় অতিষ্ঠ...যখনই কেউ কোনো জায়গা পরিষ্কার করে, ইঁদুরগুলো আমাদের দিকে চলে আসে...এটার একটা সংগঠিত, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ দরকার, যাতে ওদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

গ্রীষ্মের আগমন সংকটকে আরও গভীর করবে বলে আশঙ্কা সামাহর। সেই সঙ্গে পোকা-মশার বিস্তারও বাড়বে। তবে সবচেয়ে বড় ভয় ইঁদুর নিয়েই, সম্প্রতি যাদের সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। সামাহ ও তার আশপাশের মানুষজন বিশ্বাস করেন, সমাধানের জন্য দরকার সম্মিলিত হস্তক্ষেপ; পৌরসভা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে ধ্বংসস্তূপ সরাতে হবে, ইঁদুর নিধনের উপকরণ ও বিষ সরবরাহ করতে হবে।

মোকাবিলা কঠিন : গাজায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিষেধক ওষুধ বিভাগের পরিচালক ডা. আয়মান আবু রাহমা গাজার বর্তমান অবস্থাকে ‘স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইঁদুরের বিস্তার নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে। এর পেছনে মূলত তিনটি কারণ। জমে থাকা বর্জ্য, ধ্বংস হয়ে যাওয়া পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা, আর ধ্বংসস্তূপ ও তার নিচে পচে যাওয়া মরদেহ।

আবু রাহমা ব্যাখ্যা করেন, কামড়জনিত ঘটনায় জরুরি বিভাগ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে আসা রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে। ডায়াবেটিক রোগীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ অনেক ক্ষেত্রে তারা কামড় বুঝতে নাও পারেন, যা মারাত্মক জটিলতা ডেকে আনে।

তিনি জানান, ইঁদুর তাদের মূত্র ও বর্জ্যরে মাধ্যমেও রোগ ছড়ায়, জ্বরসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। গাজা পৌরসভার কর্মকর্তারা জানান, ইসরাইলি নিষেধাজ্ঞার কারণে ইঁদুর দমনে ব্যবহৃত বিষ আমদানি করা যাচ্ছে না; বিকল্প পদ্ধতি খোঁজার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাও প্রকট হচ্ছে। গাজা শহরের প্রধান আবর্জনার স্তূপে প্রায় তিন লাখ ঘনমিটার বর্জ্য জমেছে, যা জনবহুল এলাকায় ইঁদুরের প্রজননের এক আদর্শ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির চিন্তাভাবনা চলছে কিন্তু যুদ্ধে এ ধরনের প্রকল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সিংহভাগই ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সমাধান এখনও সীমিত।

স্বাস্থ্য সমস্যা : সমস্যার প্রতিকার না হওয়ায় গাজার ফিলিস্তিনিরা দুর্বিষহ যন্ত্রণায় ভুগছেন। তাদের একজন বাসেল আল-দাহনুন আগে থেকেই নানা রোগে ভুগছিলেন; এর মধ্যে হঠাৎ ইঁদুরের কামড় যন্ত্রণা বাড়িয়ে দিয়েছে। ৪৭ বছর বয়সি বাসেল জানান, হাসপাতাল থেকে ডায়ালাইসিস শেষে ফিরছিলেন, ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। পরে পায়ে হালকা শিরশিরানি টের পেয়ে জেগে ওঠেন। স্ত্রী তাঁবুর ভেতরে ইঁদুরের উপস্থিতি টের পেয়ে বৈদ্যুতিক টর্চ জ্বালিয়ে দেখেন তার পা থেকে রক্ত ঝরছে। 

ভাঙাচোরা এক চেয়ারে বসে আলজাজিরাকে বাসেল বলেন, পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি, তোশক ও মাদুর রক্তে ভেসে যাচ্ছে...তারপর স্ত্রী ঘুরে ইঁদুরটাকে দেখে তাড়িয়ে দেয়...তখন বুঝি, ইঁদুরটা আমার পা কামড়েছে। অসুখের কারণে আমার হাত-পায়ের অনুভূতি ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে, যে কারণে ইঁদুরের কামড় টের পাইনি।

কিডনি বিকল, ডায়াবেটিস আর ভীষণ ক্ষীণ হয়ে আসা দৃষ্টিশক্তি বাসেলকে প্রায় অন্ধ করে তুলেছে। তাকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসা দেওয়া হয়। তিনি বলেন, জানা কথা, ডায়াবেটিক রোগীর ক্ষত শুকাতে দেরি হয়, ফল আরও খারাপ হতে পারে। ডাক্তার আমার গোড়ালি আর আঙুল থেকে নমুনা নিয়েছিলেন, সংক্রমণ পরীক্ষার জন্য...দুর্ভাগ্যবশত, দুদিনের মধ্যেই ক্ষতের কারণে অস্ত্রোপচারের দিন ধার্য করা হয়।

সেই রাত থেকে বাসেল নিজের আর চার সন্তানের জন্য সার্বক্ষণিক ভয়ে থাকেন, স্ত্রী নিয়মিত খোঁজ নিলেও তার শারীরিক সীমাবদ্ধতা বড় বাধা। ‘সারা রাত ইঁদুররা তাঁবুর বাইরে কিছু না কিছু কাটে, ক্যানভাস ছেঁড়ার চেষ্টা করে...শুয়েও ওদের আওয়াজ শুনতে পাই, তিনি বলেন।

বাসেল যে শিবিরে থাকেন, সেখানে কোনো অবকাঠামো নেই, ঘুমানোর জায়গা, রান্নাঘর, নর্দমা আর আবর্জনার জায়গা সব মিলেমিশে একাকার। এই পরিবেশ ইঁদুরের বংশবিস্তারের পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী। আমি চাই, কেউ এসে রাতের বেলা এখানকার ছবি তুলুক...সংখ্যাটা বিশাল, একটি-দুটি ইঁদুর নয়...আমরা লাঠি দিয়ে ওদের মোকাবিলা করার চেষ্টা করি। 
কিন্তু বিষ বা কোনো বাস্তব সমাধান কিছুই নেই। বাসেল আক্ষেপ করে বলেন, আমি মানসিকভাবে ক্লান্ত...সত্যি ক্লান্ত, এটা কোনো জীবন নয়। আমি টাকা-পয়সা বা অন্য কিছু চাই না...শুধু একটু পরিচ্ছন্ন জায়গায় থাকতে চাই।


এফআর


  বিষয়:   গাজা  রণাঙ্গন  রোগবাহী  ধাড়ি ইঁদুর 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: