চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায় ভুট্টা চাষকে ঘিরে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঘটনা সামনে এসেছে। কালিদাসপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর ও শ্রীরামপুর গ্রামের অন্তত ৫০ থেকে ৬০ জন কৃষক নিম্নমানের বীজের কারণে সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে। প্রায় আড়াইশ বিঘা জমিতে চাষ করা নসিব-৪০৫৫ ও প্রাইম-৩৩৫৫ জাতের ভুট্টা আশানুরূপ ফলন দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, প্রতারণামূলক আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছে এই বীজ বিক্রি করা হয়েছে। প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচের পাশাপাশি অনেকে ১২ হাজার টাকা দরে জমি লিজ নিয়েও চাষ করেছেন। কিন্তু মৌসুম শেষে দেখা যাচ্ছে– কোথাও শিষ ধরেনি, কোথাও বা গাছ থাকলেও ফলন অত্যন্ত নগণ্য; অনেক ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি সর্বোচ্চ ২ মণ পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও হতাশাজনক।
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বেশিরভাগ জমিতে গাছ স্বাভাবিকের মতো বেড়ে উঠলেও শিষ (মুছা) হয়নি। যেগুলো হয়েছে, সেগুলো আকারে ছোট ও অপূর্ণ। ফলে পুরো আবাদ কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে কৃষকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাদাব্রিজ সড়কের ‘কৃষি পল্লী সিড স্টোর’ থেকে কৃষকরা এসব বীজ সংগ্রহ করেন। দোকানের মালিক নাজমুল হুদা রাব্বির বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি উচ্চ ফলনের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতি বিঘায় ৪০ থেকে ৫০ মণ ভুট্টা উৎপাদনের নিশ্চয়তা দেন। সেই আশ্বাসেই কৃষকরা ঝুঁকি নিয়ে ব্যাপক আকারে চাষ করেন। কিন্তু বাস্তবে ফলন বিপর্যয় ঘটায় এখন তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক শিমুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাড়ে তিন বিঘা জমিতে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা খরচ করেছি। এখন একেবারেই নিঃস্ব হয়ে গেছি।
কৃষক সুলতান বলেন, ৫ বিঘা জমিতে ৭৫ হাজার টাকা খরচ করেও কিছুই পাইনি– সব শেষ। লিজ নিয়ে চাষ করা কৃষক তানজেল বলেন, ঋণ করে চাষ করেছি, এখন ঋণ শোধ করব কীভাবে? আমাদের দায় কে নেবে?
অভিযোগের বিষয়ে বীজ বিক্রেতা নাজমুল হুদা রাব্বি দায় এড়িয়ে বলেন, তিনি ময়মনসিংহের এন আই টি সিড কোম্পানি থেকে বীজ সংগ্রহ করেছেন এবং সেটি ভারত থেকে আমদানি করা। তিনি দাবি করেন, ‘আমি নিজেও এমন ফলন আশা করিনি। কোম্পানির প্রতিনিধিদের আনার চেষ্টা চলছে।’
এদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশ ঘটনাটিকে গুরুতর উল্লেখ করে জানান, যেখানে বিঘাপ্রতি ৪০-৪৫ মণ ফলনের কথা, সেখানে ফলন একেবারে বিপর্যস্তÑ এটি উদ্বেগজনক।
বিষয়টি জেলা পর্যায়ে জানানো হয়েছে এবং বীজের মান ও উৎস যাচাই করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
এদিকে স্থানীয় কৃষকদের একটাই দাবি– দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে এবং তাদের আর্থিক ক্ষতি পূরণ করতে হবে। অন্যথায় এই বিপর্যয় শুধু একটি মৌসুম নয়, বরং তাদের ভবিষ্যৎ জীবিকাকেই হুমকির মুখে ফেলবে।
এফআর