মশার রাজ্যে মশারির বাণিজ্য

আদিল সরকার

জাতীয়

প্রাণিজগতের একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গ হলেও যন্ত্রণার দিক থেকে মশা মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ক্ষুদ্র কীটের সূক্ষ্ম

2026-04-25T02:46:00+00:00
2026-04-25T02:46:00+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
জাতীয়
মশার রাজ্যে মশারির বাণিজ্য
আদিল সরকার
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৪৬ এএম   (ভিজিট : ৩৪)
সংগৃহীত ছবি
প্রাণিজগতের একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গ হলেও যন্ত্রণার দিক থেকে মশা মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ক্ষুদ্র কীটের সূক্ষ্ম শুঁড়ের কামড়েই ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও চিকুনগুনিয়ার মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ, যা অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণও হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অন্যদিকে মশার এমন দাপটে দেশে বেড়েছে মশারির বিক্রি। বাংলাদেশে বর্তমানে মশারির বাজার কয়েক হাজার কোটি টাকার।
 
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, আগের তুলনায় ঢাকায় প্রায় ৪০ গুণ পর্যন্ত মশার ঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। প্রযুক্তির সহায়তায় বাজারে এসেছে নানা ধরনের মশা প্রতিরোধ ও নিধনসামগ্রী। এর মধ্যে রয়েছে- মশারি, কয়েল, স্প্রে, লিকুইড ভ্যাপোরাইজার, অডোমোস ক্রিম, ইলেকট্রিক ব্যাট এবং বিভিন্ন আধুনিক মশা নিধন যন্ত্র। তবে এত বিকল্পের মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত পদ্ধতি হিসেবে মশারির চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও রোগীদের জন্য এখনও মশারি সবচেয়ে নিরাপদ সমাধান হিসেবে বিবেচিত।

বাংলাদেশের মশারি যাচ্ছে ভারত, মধ্যপ্রাচ্যেও : দেশজুড়ে মশার প্রকোপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মশারির বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে এই খাত কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। শুধু দেশীয় বাজারেই নয়, বাংলাদেশের মশারি এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিয়েছে। ভারত, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে নিয়মিত এসব পণ্য রফতানি হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশে মশারি উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছে ঢাকার আশপাশে। নারায়ণগঞ্জের গাউসিয়া, গাজীপুরের টঙ্গী এবং নরসিংদীর বাবুরহাট এই শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ হাব হিসেবে পরিচিত। এসব এলাকায় ছোট-বড় অসংখ্য কারখানায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মশারি উৎপাদন করা হয়, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। উৎপাদন কেন্দ্র ঢাকার বাইরে হলেও রাজধানীতে এর বৃহৎ পাইকারি বাজার গড়ে উঠেছে গুলিস্তান ও চকবাজার এলাকায়।

গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া মার্কেট ও রোজ মেরিনার্স মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, এখানে বিভিন্ন মান ও দামের মশারি বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি দরে ১৩৫ টাকা থেকে শুরু করে ৮০০ টাকা পর্যন্ত মশারি পাওয়া যায়। উন্নত মানের কিছু মশারির দাম ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্তও রয়েছে। পাইকারি বাজার থেকে এসব মশারি কিনে খুচরা বিক্রেতারা বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করছেন। অনেক ব্যবসায়ী নিজেরাই নেট বা কাপড় কিনে মশারি তৈরি করে তুলনামূলক কম দামে বাজারজাত করেন। আবার কেউ কেউ সরাসরি কারখানা থেকে পণ্য এনে বিক্রি করেন।

পাইকারি পর্যায়ে ফ্যাক্টরি থেকে আনা মশারির ওপর সাধারণত ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত মুনাফা যোগ করা হয়। পরে খুচরা বাজারে সেই মশারি ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়। জেলা ও গ্রামাঞ্চলে গেলে দাম আরও বৃদ্ধি পায়- কখনো প্রতি মশারিতে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হয়।

মশারির মান, আকার, ডিজাইন ও উপাদানের ওপর ভিত্তি করে দামের পার্থক্য লক্ষ করা যায়। সাধারণ সিঙ্গেল মশারির দাম ১৩৫ থেকে ১৫০ টাকা থেকে শুরু হলেও মাঝারি ও বড় সাইজের মশারির দাম ১৭০ থেকে ২০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ৭০০-৮০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। উন্নত ডিজাইন ও প্যাকেজিংয়ের মশারির দাম হাজার টাকার ওপরে চলে যায়।
মশারির নাম হাটের মাল, নিমকি, চিনিগুঁড়া : বিভিন্ন ধরনের মশারির মধ্যে রয়েছে- হাটের মাল, নিমকি, চিনিগুঁড়া, একপাইর ডিজাইন, কুলশি ডিজাইন, পাতা ডিজাইন, কাপড় লাগানো মশারি, এম-থ্রি ডিজাইন, বেড়া ডিজাইন, প্রিন্টেড ও ডিজিটাল মশারি। যদিও এসব নাম পাইকারি বাজারে বেশি প্রচলিত, খুচরা ক্রেতারা সাধারণত মান ও দামের ভিত্তিতেই পণ্য নির্বাচন করেন।

মশারির বাজারে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রভাব : বর্তমানে মশারির দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর প্রধান কারণ কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি। অধিকাংশ মশারি পলিয়েস্টার দিয়ে তৈরি, যা জ্বালানি তেল থেকে উৎপাদিত। সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি উৎপাদন খরচে প্রভাব ফেলেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে সুতার দাম বৃদ্ধি পাওয়াও এর একটি কারণ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদনব্যয় বেড়েছে।

‘যে যেমন পারে তেমন দামে বিক্রি করে’ : ফুলবাড়িয়া মার্কেটের বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সের ম্যানেজার হাবিব হোসেন বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ মশারি পলিয়েস্টার থেকে তৈরি হয়। তেলভিত্তিক কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দাম বাড়লেও বিক্রি কিছুটা কমে গেছে। তিনি জানান, দেশীয় চাহিদার পাশাপাশি ভারতেও মশারি রফতানি করা হচ্ছে।

মজিব ট্রেডার্সের সেলসম্যান জুয়েল হাসান বলেন, পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বিক্রেতারা কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করেন। গ্রামাঞ্চলে গেলে দাম আরও বেড়ে যায়- যে যেমন পারে, তেমন দামে বিক্রি করে।

রোজ মেরিনার্স মার্কেটের আলিফ নেট দোকানের সেলসম্যান জহিরুল ইসলাম জানান, দাম বৃদ্ধি ও চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে বিক্রি কমেছে। আগে দিনে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হতো, এখন তা ৩০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় নেমে এসেছে।

‘আরামের মশারি’র দাম হাজার টাকা : কারওয়ান বাজারের ফুটপাথের বিক্রেতা আব্দুল্লাহ বলেন, কমের মধ্যে ১৫০ টাকায়ও কিছু মশারি পাওয়া যায়। তবে সেগুলো পাতলা, মশা ঢোকে। তাই এগুলো চলেও কম। এসব মশারি ছাড়া আমাদের এখানে কম দামের মধ্যে ছোট সাইজের মশারি ১৫০-২০০ টাকা, মাঝারি সাইজেরগুলো ২০০ টাকা ও বড়গুলো ২০০-২৫০ টাকায় বিক্রি করে থাকি। 

এছাড়া মাঝারি মানের মধ্যে (ভালো কুচি) ছোট ২৫০-৩০০ টাকা ও বড়গুলো ৩০০-৩৫০ টাকা এবং ভালো মানের মশারির মধ্যে (কাপড় লাগানো) মাঝারি ৪০০-৫০০ ও বড় সাইজেরগুলো ৫০০-৬০০ টাকার মধ্যে বিক্রি করে থাকি। তবে বাজারে উচ্চমূল্যের কিছু ব্র্যান্ডেড ও উন্নত প্যাকেজিংয়ের মশারিও পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলোতে আরাম বেশি। দাম পড়বে ৭০০-১ হাজার টাকা। তবে আমাদের কাছে সেগুলো নেই। আরামের মশারি চাইলে অর্ডার দিয়ে বানানো হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মশার প্রকোপ যত বাড়বে, ততই মশারি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হবে। তবে এই খাত আরও টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে প্রয়োজন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। পরিবেশবান্ধব উপাদান ব্যবহার এবং রফতানির সুযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে ভবিষ্যতে এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

সময়ের আলো/আআ





  বিষয়:   মশা  রাজ্য  মশারি  বাণিজ্য 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: