পাটকে একসময় সোনালি আঁশ বলা হতো। সোনালি আঁশ বলার অন্যতম কারণ হচ্ছে, পাটের রং ও তার আর্থিক মূল্য রয়েছে। বিদেশে এই সোনালি আঁশ রফতানি করে দেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আনা হতো। তবে সোনালি আঁশের বৈদেশিক মুদ্রার অংশীদার হয়ে যেত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সরকার। যে কারণে স্বাধীনতার আগে অর্থনৈতিক বৈষম্যের যে বিষয়টি গুরুত্ব পায় তা হলো সোনালি আঁশ পাটকে ঘিরে। স্বাধীনতার পর এই সোনালি আঁশ বৈদেশিক মুদ্রার আশার আলো দেখায়। কিন্তু মাঝপথে এসে সেই আশার আলো বেশ কিছুটা ক্ষীণ হয়ে আসে।
দেশের পাটকলগুলো আস্তে আস্তে লোকসানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। স্বাধীনতার পর পাটকলসহ আরও অন্যান্য শিল্প-কলকারখানা সরকার জাতীয়করণের উদ্যোগ নেয়। এই জাতীয়করণের কারণে সরকারকে লোকসান গুনতে হয়। আর লোকসানের জন্য ভর্তুকি দিতে সরকারকে হিমশিম খেতে হয়। যে কারণে বিশ্বব্যাংক পাট খাতে সংস্কারের জন্য বারবার তাগিদ দেয়। এই সংস্কারের নেপথ্যে ছিল পাট খাতে জরুরি ভিত্তিতে ঋণ প্রদান। আর বেসরকারিকরণ করা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশ্বব্যাংক আসলে সংস্কারের নামে পাটকলগুলো বন্ধ করার পাঁয়তারা করে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের চাপের মুখে একসময় অনেক পাটকল বন্ধ হয়ে যায়। সরকার প্রাইভেটালাইজেশন বোর্ডের মাধ্যমে এসব পাটকল বেসরকারিকরণের উদ্যোগ নেয়। তবে এই উদ্যোগ তেমন কোনো ইতিবাচক সংবাদ বয়ে আনেনি। কিছু কিছু পাটকল বেসরকারিকরণ করা হলেও উদ্যোক্তারা পাটকল পুরোপুরি চালু না করে জমি নেওয়ার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
অথচ পাট হচ্ছে দেশের টেকসই ও পরিবেশবান্ধব। অনেকে তা ভালোভাবে উপলব্ধি করেও তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। অথচ এই পাটকলগুলো ছিল একসময় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির অন্যতম পন্থা।
গত বৃহস্পতিবার বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার মূল বিষয় ছিল, বন্ধ মিল ইজারা দেওয়া। বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, বর্তমান বন্ধ থাকা পাটকলগুলোর অবস্থা, নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, অবশিষ্ট মিলগুলো কীভাবে দ্রুত বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায় তা নিয়ে সরকারের চিন্তাভাবনা রয়েছে।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, ইতিমধ্যে বেশ কিছু পাটকল বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেগুলোতে বিনিয়োগকারীরা উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। যা বেশ ইতিবাচক। আরও ছয়টি পাটকল চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই বেসরকারি খাতে হস্তাস্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। কী পরিমাণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে তা উদ্যোক্তাদের ওপর নির্ভর করছে। তবে আশা করা যাচ্ছে, সরকার বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় পাটকল বেসরকারিকরণের পথে যাচ্ছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
আর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া মানেই হচ্ছে বেকারত্ব ঘোচানো। তবে রাতারাতি বেকারত্ব ঘোচানো সম্ভব নয়। ইতিবাচক দিক হচ্ছে, বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত হচ্ছে। আমরা আশা করছি, প্রতিটি পাটকলে এক হাজারের বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আবার পাটকলে মিলভেদে প্রায় ২০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ আসবে। বিনিয়োগের এই খরা মৌসুমে পাটকল বেসরকারিকরণের মাধ্যমে যদি বিনিয়োগ আসে তা হলে দেশের অর্থনৈতিক বেশ কিছুটা চাঙ্গা হবে। তবে বিনিয়োগের নামে যেন শুধু জমি অধিগ্রহণে উৎসাহী হয় তা অবশ্য মনিটরিং করতে হবে।
সময়ের আলো/আআ